ইন্দ্রর বিবাহ , সরকার বাড়ীর বৌ , তৃতীয় পর্ব,

  ইন্দ্রর বিবাহ , সরকার বাড়ীর বৌ, তৃতীয় পর্ব

অতনু সরকার





প্রায় দুই চারদিন অতিবাহিত হইয়া গেল। তানিয়া এ বাড়ির সঙ্গে এখন বেশ মানাইয়া গিয়াছে। অভি, স্বপা,  শ্রেয়া এবং সায়নের সঙ্গে তাহার এখন বেশ ভাব হইয়া গেছে। তানিয়ার জ্যাঠাইমার কাছ থেকে তানিয়া  একবার শুনিয়াছে যে তাহাকে এই বাড়ির বড় বৌ করাহইতে পারে। শুনিয়া তানিয়া খুবই লজ্জা পাইয়া ছিল। আশাদেরীর তানিয়াকে খুবই পছন্দ। তিনি তাহার বড়দি কে এই বিষয়ে পরিষ্কার করিয়া বলিয়াছেন।  দেবলা বালা দেবী তো আনন্দে আটখানা। এমন সুন্দর চাঁদের মতো মেয়েকে ইন্দ্রের মতো ছেলের হাতে তুলে দিতে পারলে কে না খুসি হয়। ইন্দ্রের অজান্তে তানিয়ার সহিত তাহার বিবাহের কথা এক প্রকার স্থির হইয়া গেল। ইন্দ্র যানিতে পারিলেও কিছুতেই অমত করিত না। 


সেদিন দুপুরে আহার করিয়া  যে যাহার ঘরে বিশ্রাম করিতেছে। দুদিন আগের মতো শ্রেয়া ইন্দ্রের ঘরে প্রবেশ করিল। ইন্দ্র দেখিল আজ তাহার দেওয়া ফিতেটা শ্রেয়ার মাথায় সুন্দর করিয়া বাধা। 


শ্রেয়া ঘরে ঢুকিয়াই বলিল- দেখতো বড়দা চুলের ফিতেটা কেমন বাধা হয়েছে?


ইন্দ্র আর একবার ভাল করিয়া দেখিয়া বলিল- খুব সুন্দর। কে বেধে দিয়েছে রে।


শ্রেয়া-তানি দিদি। দিদিটা কি ভালো গো' বড়দা।


ইন্দ্র হাসিয়া বলিল- তাই!


শ্রেয়া - আচ্ছা বড়দা তোমার সঙ্গে তানি দিদির বিয়ে হবে? 

ইন্দ্র হঠাৎ অপ্রস্তুত হইয়া বলিল- তোকে কে বলেছে?


শ্রেয়া- কেন মা বলেছে তো।


ইন্দ্রর চোখে মুখে একঝলোক হাসি খেলিয়াক গেল। কিন্তু কিছু বলিল না।


শ্রেয়া আবার বলিল-বল না বড়দা।


ইন্দ্র - আমি তো জানি না, মাই জানে।


শ্রেয়া- তাহলে আমি তানি দিদি কে বলি।


ইন্দ্র- কি বলবি।


শ্রেয় - তানি দিদির সঙ্গে তোমার বিয়ে তাই বলব।


ইন্দ্র- দুর বোকা ও কথা বলতে নেই।


শ্রেয়া- বলব বলব। 


বলিয়া সে দ্রুত প্রস্থান করিল।


ইন্দ্র বাহিরের জানালার দিকে চাহিয়া কৃষ্ণচূড়ার ফুল গুলি দেখিতে লাগিল। ফুল গুলি যেন মনে হইতেছে আর ও লাল হইয়া গিয়াছে।


রাতে সব ভাই বোনরা পড়িতে বসিয়াছে। ইন্দ্র তাহার ঘরে বসিয়া গল্পের বই পড়িতেছিল। 


তাহার মধ্যে তানিয়া  হঠাৎ ঝড়ের বেগে ইন্দ্রর ঘরে প্রবেশ করিয়া, ইন্দ্রকে দেখিয়া থমকাইয়া দাঁড়াইয়া পড়িল। তানিয়া  ভাবিয়া ছিল ঘরে কেহ নাই। ইন্দ্র তাহাকে দেখিয়া বই বন্ধ করিয়া বলিল- কিছু বলবেন? 


তানিয়া - না। এসেছিলাম একটা গল্পের বই নেব বলে।


ইন্দ্র- নিন না।


তানিয়া  - আপনার হাতের বইটাই পড়ছিলাম, শেষ হয়নি।


ইন্দ্র বলিল- নিন, আমি না হয় অন্য বই পড়ি।


তানিয়া  বলিল  - দেখুন তো আপনার কত অসুবিধা হল। না হয়  থাক আপনি পড়ুন। 


ইন্দ্র-অসুবিধা মনে করলেই অসুবিধা। নিন। 


তানিয়া  ইন্দ্রের  হাত হইতে বইটি লইয়া বলিল - আগামী কাল, আমরা চলে যাচ্ছি। তাই ভাব্লাম বইটা শেষ করে যাই। 


ইন্দ্র বিশ্মিত হইয়া বলিল - কেন? চলে যাবেন কেন?


তানিয়া  - বাঃ আমাদের বাড়ি নেই বুঝি।


কথাটি বলিয়া এমন ভাবে হাসিল, যাহাতে পুরুষ হৃদয় বিগলিত হইয়া যায়।


ইন্দ্র হতাশ হইয়া বলিল- এখা নে বুঝি ভালো  লাগছে না? 


তানিয়া  মিষ্টি হাসিয়া বলিল - ভালো লাগছে।  শুধু আপনা কেই ভালো লাগছে না। 


ইন্দ্র হাসিয়া বলিল- কিন্তু কেন?


তানিয়া   - এতো দিন এক বাড়িতে আছি। শুধু আপনি আমাকে আপন করে নিতে পারলেন না।


ইন্দ্র প্রথমে বুঝিতে পারে নাই। পরে হাসিয়ে  বলিল- সে যদি বলেন তো দোষ দুজনের।


তানিয়া  - কিন্তু আমি অতিথি। 


ইন্দ্র হো হো করিয়া হাসিয়া বলিল- সত্যিই তুমি পার বটে। তুমি কি সত্যি চলে যাবে? 


তানিয়া - আপনার “তুমি” ডাকটা নিয়েই ফিরে যাব। আর যদি আপনাকে তুমি বলার অনুমতি দেন তাহলে আবার না হয় ফিরে আসব। 


ইন্দ্র বলিল- অনুমতির কি আর দরকার আছে ? নাকি অনুমতি দেবার জন্য তোমায় নিমন্ত্রন করব। 


তানিয়া একটু হাসিয়া বলিল - তোমার যা ইচ্ছা।


কথাটা বলিয়া সে  ঘর ছাড়িয়া বাহির হইয়া গেল।


ফাল্গুন মাসের শেষ দিক। আর দুদিন পর চৈত্রমাস পড়িবে। গরমের মাত্রা বাড়িয়াছে। আগামী বৈশাখ মাসে ইন্দ্রজিতের বিবাহ ঠিক হইয়াছে। ১৫ই বৈশাখ তাহার বিবাহ। সেই উপলক্ষে বাড়িটি আবার রঙ করা হইতেছে। আরও কি কি করিতে হইবে তাহার একটা খসড়া তৈরী করা হইয়াছে। সেই মতো ধীরে ধীরে কাজ হইতেছে। ভাই-বোনদের মধ্যেও একটা উৎফুল্লতা দেখা যাইতেছে।


হ্যাঁ তানিয়ার সহিত তাহার বিবাহ। ইন্দ্র প্রথমে শুনিয়া বেশ খুসি হইয়াছিল। এখন সে স্বপ্ন দেখিতে শুরু করিয়াছে। স্বপ্ন আর কল্পনার জগতে তাহার 'মন এখন উড়িয়া যাইতেছে। কোকিলের ডাক, কৃষ্ণচূড়ার রঙ ইন্দ্রর মন মনকে উদাস করিতেছে।


দেখিতে দেখিতে চৈত্র মাস কা্টিয়া গেল। তাহার পর আরও কয়েক দিন অতিবাহিত হইয়া বিবাহের দিন উপস্থিত হইল। আর খুব ঘটা করিয়া মহাসমারহে তাহাদের বিবাহ হইয়া গেল।


বাড়িতে লোকজন আশা দেবী-বধূবরণ করিল। সকলেই নতুন বৌকে লইয়া ব্যস্ত। আশা দেবার মনের মতো পুত্র বধূ হইয়াছে। গদ গদ হইয়া তাই আশা দেবী তাহার সমস্ত আত্মীয় দের সহিত পুত্রবধূর পরিচয় করহিরা দিতেছে। এমন করিয়া সেদিন কাটিয়া গেল।


ফুলশয্যার রাত। অতিথি অভ্যাগতদের আহার সমাপ্ত হইয়াছে। দুরের কেহ কেহ চলিয়া গিয়াছে। কেহ থাকিয়া গেল সকালে যাইবে।  সব শেষে ইন্দ্র তাহার ঘরে প্রবেশ করিল। রজনী গন্ধা আর বেল ফুলে ঘর সাজানো, তাহারই গন্ধে ঘর আরো মনরম হইয়া রহিয়াছে। ইন্দ্র ধীরে দরজা বন্ধ করিয়া কুন্তি নদীর দিকে যে জানালাটা রহিয়াছে তাহার কাছে গিয়া দাঁড়াইল। চাঁদের আলোয় নদীর জল দেখা যাইতেছে। তানিয়া  বিছানা হইতে নামিয়া ধীরে ধীরে ইন্দ্রর পাশে গিয়া দাঁড়াইল। তাহার পর ইন্দ্রর হাত ধরিয়া  বলিল- কি ভাবছ? 


ইন্দ্র তাহাকে একটু কাছে টানিয়া লইয়া বলিল-দেখ বাইরের দৃশ্যটা কি সুন্দর।


তানিয়া  বাহিরের দিকে চাহিল। তাহার পর বলিল- রাত অনেক হলো শোবে না?


ইন্দ্র - আজকের রাতটা এসো দুজনে গল্প করে কাটাই।


তানিয়া - এসো।


তাহারা খাটে আসিয়া বসিল।


এবার ইন্দ্র বলিল- তুমি খুসি তানিয়া ?


তানিয়া  ইন্দ্রর হাতটি নিজের হাতের মধ্যে লইয়া বলিল- কি ভীষন, তুমি?


ইন্দ্র - আমি! আমি তোমার থেকেও খুসি।


তানিয়া  -ইস্।


ইন্দ্র বলিল - আমাদের বাড়িতে মানিয়ে নিতে পারবে তো? আমারা কত ভাই বোন দেখেছ তো? 


তানিয়া  - তুমি কি মনে কর?


ইন্দ্র এবার তানিয়াকে নিজের কাছে  টানিয়া তাহার মুখে একটি দীর্ঘ চুম্বন করিয়া বলিল- আমি বিশ্বাস করি তুমি সব পারবে। 


তানিয়া , ইন্দ্রর বুকে মাথা রাখিয়া বলিল- সেই আর্শিবাদই কর; যেন আমি সব পারি।


তাহার পর আবার দীর্ঘক্ষন চুপ করিয়া গেল দুজনেই। কোলাহল মুখর বিয়ে বাড়ি এখন সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ।


আর সেই গভীর রাতের স্নিগ্ধ নিস্তব্ধতার মধ্যে এক নব দ্যস্পতি পরস্পরের দিকে চাহিয়া বসিয়া আছে। বহুক্ষণ পর তানিয়া  বলিল- এ্যই এসো শুয়ে খ  আমার ভীষন ঘুম পাচ্ছে।


সারা দিনের পরিশ্রমে  ইন্দ্রর ও ঘুম পাইতে ছিল। তাই একে অপরের নিবিড় বাহু বন্ধনে আবদ্ধ হইয়া তমসাময় সেই পুষ্প রজনীতে মিশিয়া গেল। 


আশ্বিন মাস। বিবাহের ছয় মাস পরের কথা। দুর্গা পূজা হইয়া গিয়াছে। পূজার সময় তানিয়া  বাবার বাড়িতে গিয়াছিল। এখন সে আবারে নিজের বাড়িতে আসিয়াছে। তানিয়ার বিবাহিত জীবন অত্যন্ত সুখে কাটিতেছে। 


শ্বাশুড়ি- বৌয়ে ভীষন ভাব। আশ্বিন মাসের শেষ সপ্তাহ চলিতেছে। দুই-তিনদিন ধরিয়া আকাশে মেঘ জমিতেছে। কিন্তু আজ বিকালে হঠাৎ বৃষ্টি-পাত শুরু হইল। কেহই বাড়ির বাহিরে যাইতে পারিল না। বিকালে তানিয়া  তাহার শ্বাশুড়ির কাছে চুল বাধিতে যায়। নিত্য দিনের মতো আজ ও আশা দেবী, তানিয়ার চুল বাধিয়া দিতেছিল। হতাৎ আশা দেবী খুব বুকের যন্ত্রনা অনুভব করিয়া মেঝেতেই পড়িয়া গেল। তানিয়া চিৎকার করি্যা সকলকে ডাকিল। তাহার পর শ্বাশুরির মাথা নিজের কোলে তুলিয়া কাপড়ের আঁচল দিয়া বাতাস করিতে লাগিল। এরই মধ্যে ইন্দ্র, অভি- সকলেই ছুটিয়া আসিল।


কিন্তু আশা দেবী যন্ত্রনায় ছটফট করিতেছে। ইন্দ্র, অভিকে ডাক্তার- আনিতে পাঠাইল। আশাদেরী কোন রকমে বলিল- শ্রেয়া আর সায়ন কে একবার নিয়ে আয়।


তাহাদের ডাকিতে যাইতে হইল না। তাহার পাশেই দাঁড়াইয়া ছিল। ইন্দ্র তাহার ছোট ভাই-বোন দুটিকে তাহার মায়ের কাছে বসাইল। আশা তানিয়ার একটি হাত ধরিয়া বলিল- মা, এই শ্রেয়া আর সায়ন কে তোমার হাতে তুলে দিলাম তুমি এদের মানুষ কর। এদের যেন কোন কষ্ট না হয়। তানিয়া রোদন করিয়া  বলিল- তোমার কথা আমি রাখব। কিন্তু...


আর কিছু বলিতে পারিল না। কান্নায় তাহার কন্ঠ বন্ধ হইয়া গেল।


ইতিমধ্যে অভি ফিরিয়া আসিয়াছে। আশা ইন্দ্রর হাত ধরিয়া তাহার অন্য ছেলে মেয়ের দিকে চাহিয়া বলিল-ইন্দ্র এদের দেখিস।


ব্যাস তাহার পর আশা দেবী- চিরদিনের মতো স্বদ্ধ হইয়া গেল। বাহিরে বৃষ্টি বাড়িতেছে। ডাক্তার আসিল কিন্তু কোন লাভ হইল না। সকলের উচ্চ ক্রন্দনে বৃষ্টিকে উপেক্ষা করিয়াও আসেপাশের লোক ছুটিয়া আসিল।




পৌষ মাস। এবার বেশ শীত পড়িয়াছে। পর পর দুটি মৃত্যু ইন্দ্রদের বাড়িটাকে একেবারে স্তব্ধ করিয়া দিল। তানিয়া  এতো বড় একটা পরিবারের সমস্ত কাজ করিতে করিতে হাঁপাইয়া যায় কিন্তু কমনও মুখ ফুটিয়া বলে না যে সে ক্লান্ত। কি এক অসাধারন  ধী ক্ষমতা আছে তার,সে কথা কেহ বলিতে পারে না।  সব থেকে বড় কথা এই সে  বাড়ির প্রত্যেক সদ্যস তাহার বশে। অভিজিৎ, স্বপন, শ্রেয়া বা সায়ন বৌদি বলিতেই কাত্। আর সায়ন তো তানিয়ার ছেলের মতো হইয়া গিয়াছে। তানিয়া , খাইয়ে দিলেই সে খাইবে, পরিয়ে দিলে পরিবে নয় তো কিছুই করিবে না। এই সব কান্ড দেখিয়া ইন্দ্র খুব আনান্দ পায়। আর তানিয়া এদের সেবা করেই আমান্দ পায়।


দিন যায় মাস যায় সরকার বাড়ির-শোক কাটিয়া আবার সুখের দিন ফিরিয়া-আসিয়াছে। আশা দেবীর পোড়া কপাল সে এই সুখ দেখিয়া যাইতে পারিল না।


বৌদি অন্ত প্রাণ শ্রেয়া আর সায়ন স্কুলের সময় টুকু ছাড়া বাকি সময় বৌদির গা ঘেসিয়া থাকে। আর তানিয়া, সেও তাহার ছোট ননদ আর দেওয়রের জন্য সমস্ত স্নেহ উজাড় করিয়া দেয়। আঠার বছর বয়সে তানিয়ার বিবাহ হয়। একটি বছর পার হইয়া গিয়াছে এখন তাহার বয়স উনিশ। কিন্তু কি আশ্চর্য এই-একটি বছরে তানিয়া পাকা গিন্নী হইয়া উঠিয়াছে। একার হাতে সমস্ত পরিবারের সকলের চাহিদা বজায় রাখিয়া সকলকে খুসি করিয়াছে। অভি তাহার  সমবয়সী-বা তাহার থেকে বড় হইলেও তাহার কাছে একে বারে শান্ত। বৌদির কথায় ওঠা বসা। তানিয়া ও তাহাদের আবদার বজায় রাখে। সে আবদার হোক না কোন নতুন খাওয়ার  বা দাদার কাছ হইতে হাত খরচ চাহিয়া দেওয়া বা আরো কত কি।


প্রথম পর্ব


দ্বিতীয় পর্ব 


Post a Comment

You are Welcome to the Kotha Koli

Previous Post Next Post