সায়নের বাড়ী ফেরা , সরকার বাড়ীর বৌ দশম পর্ব

 সায়নের বাড়ী ফেরা , সরকার বাড়ীর বৌ দশম পর্ব 

অতনু সরকার









তারক আর সৌম্য ঠিক সময়েই গাড়ি লইয়া হাজির হইল। আমি ও ফিরিয়া আসিলাম আমার আস্তানায়। ফিরিবা মাত্র অন্যান্য বন্ধুরা  ছুটিয়া আসিল।  বৌদি খবরটা পাইয়াছিল কিন্তু আসিতে পারে নাই। তখন ও দু-চার জন বন্ধু রহিয়াছে। আর সেই সময় অন্দর মহলের দরজায় দুম দুম করিয়া শব্দ হইতে লাগিল। সৌম্য গিয়া দরজাটি খুলিয়া দিল। দেখিলাম ছোট সোনা আমার ঘরে  প্রবেশ করিল। সে প্রবেশ করিয়াই বলিল- ছোট কাকা তুমি কোথায় ছিলে! মা যে রোজ রাতে তোমার জন্য কাঁদে। তুমি বাড়ী আসনা  কেন?


আমার মাথায় যেন আকাশ ভাঙিয়া পড়িল। এই বৌদি আর এই ভাইঝি কে ছাড়িয়া আমি অপরের ঘরে ছিলাম। 


আমাকে নিরুত্তর দেখিয়া সোনা বলিল- তোমার পা কেমন করে ভাঙল ছোট কাকা? তুমি আর কোথায়ও যাবে না তো? 


আমি তাহাকে কাছে টানিয়া আদর করিয়া বলিলাম-না রে আর যাব না।


সোনা এই বার আমার পাশে আসিয়া বসিল। কিছুক্ষ কোন কথা বলিল না। আমরা বন্ধুরা মিলায়া গল্প করিতে ছিলাম। গল্পের  ফাঁকে সঞ্জয় হোটেল হইতে দুপুরের জন্য কিছু খাবার আনিয়া দিল। তাহার পর তাহারা চলিয়া গেল।


এইবার আমি সোনা কে বলিলাম- তোর মা কি করছে রে?


সোনা- রান্না করছে।


আমি- স্কুলে যাসনি

সোনা- না, তুমি আসবে বলে।


আমি- তোর মা বুঝি খুব কাঁদতো?


সোনা- হ্যাঁ তো। তুমি আর কখনো যাবে না বল।


আমি তাহাকে কাছে টানিয়া তাহার ছোট্ট মুখে চুম্বন করিয়া বলিলাম - না রে যাব না।


সোনা- তোমার পা কবে ভালো হবে ছোট কাকা?


আমি- খুব তাড়াতাড়ি হবে।


আমাদের কাকা-ভাইঝির কথার মাঝেই আমার দু-জন ছাত্র-ছাত্রী আসিয়া পড়িল।


দেবু- কেমন আছ দাদা?


আমি- খুব ভালো। তোদের কি খবর বল?


কাকলি - তোমার পা ভাঙার পর কি করে ভালো থাকা যায় দাদা?


আমি একটু হাসিয়া বলিলাম- কেন ? ভালো থাকা যায় না কেন? 


কাকলি - তুমি ভালো থাকলেই আমরা ভালো থাকব।


দেবু -  প্লাস্টার কবে খুলবে?


আমি-তিন-চার সপ্তা তো থাকবে। 


কাকলি - তোমার খেলার কি হবে দাদা?


আমি-তাই তো ভাবছি।


দেবু-খেলতে পারবে তো আবার।


আমি- নিশ্চই। কিন্তু শোন আজ থেকেই তোরা পড়তে চলে আয় বুঝলি?


কাকলি - আজ থেকে?


আমি- হ্যাঁ সবাইকে খবরটা দিস্।


সোনা এতোমান চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল- ছোটকাকা আমি ও আসব কিন্তু।


আমি- অবশ্যই।


দে্বু- সোনা এতোদিন কি করে ছিল তোমায় ছেড়ে?


আমি- কেন বৌদির কাছে।


কাকলি এইবার সোনা কে কাছে ডাকিয়া আদর করিয়া বলিল- দাদা এখন আসি তাহলে।


দেবু- আমি চলি। সন্ধ্যের সময় পড়তে আসব।


আমি- হ্যাঁ, মনে থাকে যেন।


সকলেই ক্লাস নাইনের ছাত্র ছাত্রী। দু-জন আছে অষ্টম শ্রেণীর। বেশির ভাগই পাড়ার ছেলে মেয়ে। তাই রাতে পড়াইতে কোন অসুবিধা হয় না।  জীবনের কিছু কিছু ঘটনা মনের মধ্যে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। সেই ক্ষত আর সারিতে চাহে না। সারা জীবন কষ্ট দেয়।। আমার জীবনে আমার  বড় বৌদির আর্বিভাব এমন একটি ঘটনা যাহা আমার জীবন কে একাটা স্বাচ্ছন্দ দিয়াছে। আপদের বিপদে বৌদি যেমন আমাকে রক্ষা করিয়াছে তেমনই আবার আমার প্রত্যেক কাজে দিয়াছে সুগভীর অনুপ্রেরণা। আর আজ এই দুঃখের দিনে ও কি তাহাকে কাছে পাইব না! নিশ্চই কাছে পাইতাম।  কিন্তু আমি তো আলাদা থাকিতে চাহি নাই। আমাকে জোর করিয়া  আলাদা করা হইয়াছে। 


সকলেই পড়িয়া চলিয়া গেল। আমি সকালের হোটেল হইতে আনিত কিছু খাবার রাখিয়া ছিলাম রাতের জন্য। তাহাই আহার করিয়া শয্যা গ্রহণ করিলাম। কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসিতেছিল না।


ঠিক তখনই ভিতরের দরজার কড়া নাড়িয় উঠিল। আমি কয়েক বার বেশ সর্তক হইয়া শুনিলাম। তাহার পর ভাবিলাম কে হইতে পারে। রাত অনেক হইয়াছে। মেঝদা বা ছোটদা উপরে সুখনিদ্রায় মগ্ন। তবে কি বৌদি? আবার শব্দ হইল। আমি কষ্ট করিয়া কোন ক্রমে দরজাটি খুলিলাম এবং দেখিলাম সত্যই বড়দা আর বৌদি দাঁড়াইয়া আছে। দরজা খোলা মাত্র তাহারা ঘরে  ঢুকিল। বড়াদা খুব সর্তক হইয়া দরজা বন্ধ করিয়া দিল। 


বৌদি বলিল-আমার উপর এখনো তোর রাগ যায়নি? 


আমি তাহাদের বসিতে বলিয়া বলিলাম-বৌদি তোমাদের উপর আমার কোন রাগ নেই। ওনারা জোর কারে আমায় নিয়ে গেলেন।


বড়দা- আমাদের না জানাস তোর বউদিকে জানাবি। যাক কেমন আছিস বল।


আমি-ভালো বড়দা। কিন্তু তোমরা এতো রাতে কেন?


বড়দা- সবইতো জানিস। ওরা চায় না যে আমি বা তোর বৌদি তোর সঙ্গে কোন সম্পর্ক রাখি। আসলে বাড়ীরতে একটা কালো মেঘ জমেছে আমি তাই কাউকে ঘাটাতে চাইছি না। 


আমি একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিলাম-জানি! 


বৌদি আমার মাথায় হাত বুলাইতে বুলাইতে বলিল-রাদিন তোকে নিয়ে কম ভাবিনি।


আমি-শুনেছি।


বৌদি - কার কাছে!


আমি- সোনার কাছে।


বড়দা- খুব পাকা হয়েছে রে মেয়েটা। উঠতে বসতে শুধু তোর কথা।


বৌদি- আজ তো শুনলাম হোটেলের খাবার এসেছে, কাল কি হবে? 


আমি হাসিয়া বলিলাম- কাল রান্না হবে।


বড়দা বাজার?


বৌদি- বাজারে কি আমি যাব?


আমি আবার হাসিয়া বলিলাম- তুমি যদি বাজারে যাও তাহলে এই পা নিয়ে আমারও ঘরে বসে থাকা উঠিত নয়। কালকে অপু আসবে ওই বাজার করে দেবে।


বড়দা- সাবধানে থাকিস্। চল আমরা যাই।


বৌদি চলিয়া গেল। আমি আবার দরজা বন্ধ করিয়া শুইয়া পড়িলাম। এতোদিন পর আবার সেই মাতৃসমা বৌদির স্নেহ পাইয়া আমি নিচিন্ত মনে ঘুমাইয়া পরিলাম।


তিন মাস পরের কথা। এখন আবার মাঠে যাইতে শুরু করিয়াছি। ধীরে ধীরে অনুশীলন করিতেছি। এই তিন মাসে আমার বন্ধুরা আমার জন্য যাহা করিয়াছে তাহা ভুলিবার নহে। ধন্যবাদ দিয়া তাহাদের ছোট করা যায় না। তারক, সৌম্য, অমরের মতো বন্ধু তো সবাই পায় না। বহুদিন পর আবার তাহাদের সঙ্গে অনুশীলনে নামিলাম।


ধীরে ধীরে আমি সুস্থ হইয়া উঠিলাম। কলকাতার যে  বড় ক্লাবে খেলার ডাক আসিয়া ছিল , তাহারা আমার সঙ্গে আর যোগা যোগ করিল না। কিন্তু ভাঙিয়া পড়িলাম না। বৌদি মাঝে মাঝে রাতে আসে  আমার সঙ্গে দেখা করিতে। কোন দিন বড়দা থাকে কোন দিন থাকে না। বড়দা জানে আমার সহিত বৌদির সম্পর্ক কেমন। একদিন রাতে বৌদিকে আমার হতাশার কথা বলিলাম। একটি  কথা বলিতে ভুলিয়া গিয়াছি। এক মাস আগে বৌদি একটি পুত্র সন্তানের মা হইয়াছে। রাতে তাহাকে ঘুম পাড়াইয়া আমার কাছে আসে। আমার কথা শুনিয়া প্রথমে বৌদি আমাকে তাহার কোলে টানিয়া লইল। আমি তাহার কোলে মাথা রাখিয়া শুইয়া পড়িলাম। মা যেমন তাহার সন্তান কে আদর করে তেমনি বৌদিও আমাকে আদর করিতে করিতে বলিল- ভেঙে পরিস না। তোর সঙ্গে কেউ না থাক আমি তো আছি। দেখবি তুই অনেক বড় হবি। আমি বলছি। আমি তোর জন্য ঠাকুরকে কত ডাকি। আমার ডাক বৃথা হবে না রে।


আমাকে প্রেরনা আর উৎসাহ দিয়া বৌদি চলিয়া যায়।  বৌদির কথা বৃথা হইল না। বৌদির অনুপ্রেরনা আমাকে শক্তি দিয়াছে সাহস দিয়াছে। কিছুদিন পর শ্রীরামপুর একটি ফাইনাল ম্যাচ খেলিতে গিয়া আবার বড় ক্লাবের কোচের নজরে পড়িলাম। আবার আমার মাত্রা শুরু হইল। তারক, সৌম্য, অমররা কালকাতায় ফাস্ট ডিভিশনে খেলিত। আমি ও খেলিতাম। কিন্তু এবার আমি বড় ক্লাবে। অন্যরা যা টাকা পায় আমি তাহার অনেক কমে চুক্তি করিলাম। কারণ এ বছরটা আমাকে প্রমান করিতে হইবে।এবার শুধু এগিয়ে যাবার পালা। আবার আমি আমার সুনাম ফিরিয়া পাইলাম। আমার পাড়ার লোক রেডিও তে আমার খেলা শোনে, আমাকে ভালোবাসে শ্রদ্ধা করে। আমি ও তাহাদের সেই ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা কে সম্মান করিতে চেষ্টা করি। আমার সাফল্যে সব থেকে বেশি খুশি হয় আমার বৌদি। মা থাকলে সেও খুশি হতো। বৌদি গোপনে আমার কাছে একতা আবদার করে ছিল, তাকে একটা রেডিও কিনে দিতে হবে। কারণ সে আমার খেলার ধারাবিবরণী শুনিতে চায়। আমি তাহাকে একটি রেডিও দিয়াছি। 


দেখিতে দেখিতে একটি বছর কাটিয়া গেল। ছাত্র-ছাত্রীরা মাধ্যমিক দিয়াছে। এখন আর  আমি পাড়াইবার সময় পাইতেছি না। তাই পড়ানো বন্ধ করিয়া দিয়াছি।  রাতে বন্ধুরা বাড়িতে আসে আড্ডা দিতে। আমার বাড়ী বন্ধুদের আড্ডার আস্তানা। এই আড্ডায় শুধু খেলোয়ার আর পাড়ার ঘনিষ্ঠ কয়েক জন থাকে।


তখন বর্ষা কাল। আমাঢ় মাস। পু্রো দমে খেলা চলিতেছে। ৩০শে আষাঢ়  আমার জন্ম দিন। সেই দিন সব বন্ধুদের নিমন্ত্রণ করিলাম। 


সকালে তারক আর সৌম্য কে লইয়া বাজার করিতে চলিয়া গেলাম। এ বছর এই দুজনের ও এক বড় ক্লাবের ডাক আসিয়াছে। তিন জনে হই হই করিতে করিতে বাজারের পথ ধরিলাম। 


সেদিন বেশ আনান্দ করিয়া দিনটি কাটিয়া  গেল।


Post a Comment

You are Welcome to the Kotha Koli

Previous Post Next Post