পুরুষের হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা যন্ত্রণা
হাসির আড়ালে যন্ত্রণা আসবে কোথা থেকে তাই না? কিন্তু সব হাসি সব সময় মনের আনন্দ বা আনন্দের আতিশ্যকে প্রকাশ করে না। কোন কোন হাসি যন্ত্রনাকে ঢেকে রাখার বহিঃপ্রকাশ হয়ে থাকে। আসলে শিশুর হাসি যেমন সরল, একজন নারীর হাসি যেমন মন ভোলানো তেমনি পুরুষের হাসি তার জীবনের যন্ত্রণাকে ভুলিয়ে রাখার। যদিও সব পুরুষের কথা আমি বলছি না। তাই অযথা কেউ আবার গায়ে মেখে নেবেন না।
পুরুষ হয়ে জন্ম যখন নিয়েছে তখন পরিশ্রম আর পরিশ্রম দিয়ে সংসারকে টিকিয়ে রাখাই আমাদের লক্ষ্য। আমাদের লক্ষ্য কিভাবে পরিবার-পরিজনকে নিয়ে একটু ভালো থাকা যায়। আর একটু ভালো থাকতে গিয়ে যে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে চলতে হয় তা একমাত্র পুরুষরাই বোঝেন।
বিশেষ করে নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত এমনকি সাধারণ উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোতেও এই একই চিত্র ধরা পড়ে।। পরিবারে সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষেত্রে মায়ের বা একজন নারীর অবদান যেমন অস্বীকার করা যায় না তেমনি সন্তান গর্ভে আসার পর থেকেই সেই সন্তানকে মানুষ করা পর্যন্ত দীর্ঘ ২৫-৩০ বছরের লড়াইকে কখনোই অবহেলা করা যায় না।
আমরা শুধু পরিবারে নারীদের পরিশ্রমটাই দেখি অবশ্যই তারা পরিশ্রম করেন তাদের প্রত্যেকটি পরিশ্রমকে আমি অত্যন্ত সসম্মান ও শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রণাম জানাই। কিন্তু একজন পিতা হিসেবে পরিবারের একজন দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে একজন সন্তানকে পালনকারী হিসেবে নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন পুরুষকে যে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করতে হয় সেই পরিশ্রম অনেক সময় মূল্যহীন হয়ে পড়ে পরিবারের কাছে। সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটনির পর বাড়ি এসে যখন নিজের পরিবারের কাছ থেকে সামান্য একটু ভালোবাসা পায় না, তখন।
ভাবুন এই প্রচন্ড গরমে একজন পুরুষ বা একজন মহিলা যারা ট্রেন ধরে শহর বা শহরতলিতে ছুটে চলেছেন কাজে, কেউবা মাঠে-ঘাটে কাজ করছেন। গরমের এই সমস্ত রোদ্দুর কে মাথায় নিয়ে ঘামে ভেজা শরীরটাকে নিয়ে যখন বাড়ি ফেরেন তখনও যদি দেখেন বাড়িতে অশান্তি তখন বাড়ি, পরিবার বিষের মত হয়ে ওঠে। তারপরও নিজেকে সামলে হাসিমুখে সবকিছু মানিয়ে নিতে হবে তার কারণ পুরুষেরা রেগে গেলে অশান্তি আরও বাড়বে।
আর এই বর্তমান দুনিয়ায় একজন পুরুষ যখন হাড়ভাঙ্গা খাটনি খাটছে, বাইরে রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে বা রাস্তায় কর্মক্ষেত্রে বা মাঠে কৃষি কাজে ব্যাস্ত তখন তার পরিবার হয়তো ফ্যানের তলায় বসে মোবাইল নিয়ে ফেসবুকে অন্য কোন পুরুষের সঙ্গে চ্যাট করতে ব্যস্ত। সেটা দেখার বা জানার পরও সব কিছু না জানার ভান করে হাসিমুখে মানিয়ে নিতে হবে সংসার কে টিকিয়ে রাখার জন্য।
একজন পিতা হিসেবে যিনি দিনের পর দিন পরিশ্রম করে একজন সন্তানকে পালন করছেন। ৩০ বছর ধরে যাকে লালন পালন করে মানুষ করে তুলেছেন সেই সন্তান যখন খেতে দেয় না তখন হাসিমুখে পথে নামতে হবে। তখনো মুখ থেকে হাসি মিলিয়ে যায় না পুরুষের, কারণ সেই হাসি তার জীবনের সমস্ত যন্ত্রণাকে ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য। যন্ত্রণাকে ঢেকে রাখার জন্য। মুখে সে হাসির মধ্যে সত্যি কোন আনন্দ থাকে না। লোক দেখানো। ভালো আছি কথা টা বলা কিন্তু আদৌ ভালো কি থাকে।
সারাদিন ক্লান্ত হয়ে একজন প্রেমিক যখন তার প্রেমিকার কাছে ছুটে আসে, হয়তো আধ ঘন্টা দেরি হওয়ার জন্য শুনতে হয় নানান কথা। তবুও সেই প্রেমিক বুঝতে দেয় না যে তাকে কত পরিশ্রম করে আসতে হয়েছে তার সঙ্গে দেখা করার জন্য। হাসিমুখে পুরোটাই চাপা রেখে প্রেমিকার সমস্ত গঞ্জনা সহ্য করে নেয়।
তাই হাসিটা সব পুরুষের কাছে সব সময় আনন্দের হাসি হয় না। জানি আপনারা হয়তোবা এই বক্তব্যের সঙ্গে কেউ একমত হবেন না আবার কেউ বা একমত হবেন কিন্তু বিতর্ক আর তর্ককে সরিয়ে রেখে একবার অবশ্যই ভেবে দেখবেন কথাগুলো। আমরা পুরুষরা সবাই জীবনের যন্ত্রণাকে ভুলে থাকার জন্য বা লোককে ভালো আছি এটা বোঝানোর জন্য যতটা হাসি, ঠিক ততটাই ভালো থাকি কি?
কর্মক্ষেত্রে কত লাঞ্ছনা কত গঞ্জনা সহ্য করতে হয়। কর্মক্ষেত্রে কতটা পরিশ্রম করতে হয় যদিও যে সমস্ত মহিলারা কর্মক্ষেত্রে কর্মরত আছেন তাদেরকে আমি সম্মান করছি তারা বুঝেন জানেন কিন্তু বিষয়টা যেহেতু পুরুষ কেন্দ্রিক তাই মহিলাদের যথার্থ সম্মান দিয়ে আমি শুধুমাত্র পুরুষদের আলোচনা করছি। সমাজে পুরুষদের অনেক কিছুই সহ্য করে চলতে হয় যত পরিশ্রমের কাজ তার আশি শতাংশই পুরস্কার করেন এটা তো অস্বীকার করা যায় না। টাকা রোজকারীর চিন্তা পরিবার-পরিজনকে ভালো রাখার চিন্তা সমস্ত কিছু মাথায় নিয়ে দুশ্চিন্তার পাহাড় বয়ে নিয়ে গিয়ে বেড়ানো একটা পুরুষের নাম পিতা। বুঝতে পারি হয়তো আমি ভালো বাবা নই। ভালো সন্তান নই বা ভালো স্বামী নই। তবু হাজার যন্ত্রণাকে চাপা দেওয়ার জন্য হাসিটা কেই অস্ত্র করে রেখেছি আর পাঁচটা পুরুষের মতন।
