অশরীরির চিঠি

 অশরীরির চিঠি 

অতনু সরকার 


অশরীরির চিঠি




সন্ধ্যা সাত টা কুড়ির ট্রেন টা ধরলাম খাগড়া ঘাট থেকে। ফিরব ব্যান্ডেল। মাঝে কাটোয়া নেমে ট্রেন পাল্টাতে হবে। অর্ধেক ফাঁকা ট্রেন। জানালার ধারে বসে আছি। সন্ধ্যার নরম বাতাস এসে এলোমেলো করে দিয়ে যাচ্ছে ভাবনার পর ভাবনা। এটা একটা এক্সপ্রেস ট্রেন তাই সব জায়গায় দাঁড়াবে না। আমার শীতের সামনে টা পুরো ফাঁকা তাই পা মেলে আরাম করে বসলাম। ট্রেন চলছে আপন গতিতে। আষাঢ় মাস প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে এবার। যেখানে মেঘ সেখানে বৃষ্টি। এখন একটু কমেছে তাই জানালা খুলে বাইরে হওয়া খেতে খতে চলেছি। জীবন এমন ই যে কে কখন কোথায় থাকে বোঝা মুশকিল। দেখতে দেখতে জীবন থেকে দু কুড়ি বর্ষা চলে গেল। এমনি এক আষাঢ় মাসে এক অজ পাড়া গায়ে আমার জন্ম। তারপর কত বর্ষা কত বসন্ত কেটে গেলো। এখন আমি আমার কাছে পরিপূর্ণ মানুষ। কিন্তু জীবনে ঝড় ঝাপটা কম আসেনি। প্রতিমুহূর্তে ঝড় সামলাতে হয়। তাই যখন এই লম্বা ট্রেন সফর করি তখন মনে হয় মন ভরে বাইরের বাতাস নিয়ে যাই। 


সালারে দাঁড়ালো ট্রেন। আবার ছাড়লো। আস্তে আস্তে করে গতি বাড়ছে। ঠিক তখনই এক ভদ্র মহিলা এসে বসলেন আমার সামনে। এক দৃষ্টিতে দেখে মনে হলো বড়ই ক্লান্ত আর অবসন্ন। হতে পারে সারা দিনের কাজের শেষে ফিরছে আপন ঠিকানায়। তাই এমন বিমর্ষ লাগছে। এটাই স্বভাবিক।

 পরিশ্রান্ত শরীরটাকে জানালার পাশে এলিয়ে বসলেন তিনি। বাইরের দিকে উদাস ভাবে তাকিয়ে ছিলেন।  অন্ধকার ভেদ করে ট্রেন ছুটে চলেছে আপন গতিতে। আমি ব্যাগ থেকে জলের বোতলটি বার করলাম জল খাব বলে।  জল খেয়ে যখন রাখতে যাব ঠিক তখনই সেই ভদ্রমহিলা বললেন  - “আমায় একটু জল দেবেন?  খুব পিপাসা পেয়েছে।  


ব্যাগে এটি নতুন জলের বোতল ছিল। সেটা বের করে তার হাতে দিয়ে বললাম - রাখুন। 

ভদ্রমহিলা বললেন - আপনার অসুবিধা হবে না?  আপনি হয়তো দূরে যাবেন। 

আমি বললাম -  আমার অসুবিধা হবে না।  আমার যা রয়েছে তাতে চলে যাবে।  দরকার হলে পরে দেখা যাবে । 


ভদ্র মহিলা এক নিমিষে জলের বোতলের অর্ধেকটা জল পান করলেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন -  “কি যে শান্তি পেলাম। সারাদিন কিছু খাওয়া হয়নি। একটা ঝড় গেছে বুঝলেন ঝড়”।

 

আমি কৌতুহলি হয়ে বললাম- সে কি সারাদিন কিছু খান নি কেন? খুব ব্যস্ত ছিলেন বুঝি?

 

মহিলা জানালার পাশ দিয়ে রাতের অন্ধকারে কিছু একটা খুঁজছিলেন বোধ হয়।  জানালার দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন -  “ঝড় গেছে শরীরের উপর দিয়ে  ঝড় গেছে মনের উপর দিয়ে। তাই আর খাওয়া হয়নি, আর তাছাড়া আমার কাছে টাকাও নেই। কিভাবে যে পালিয়ে এসেছি”।

 

আমি বললাম - পালিয়ে এসেছেন মানে?  ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম না যদি কিছু মনে না করেন … 

 

ট্রেনের যে জানলার ধারে দুজনে বসেছিলাম সেই জায়গাটাতে আর কেউ ছিল না। ভদ্রমহিলা বললেন - “তিনি কর্মক্ষেত্র থেকে পালিয়ে এসেছেন। একমাস হলো একটা হোটেলে তিনি কাজ করতেন। কিন্তু ইদানিং তাকে জোর করে কিছু অবাধ্য কাজ করতে বলা হচ্ছিল।তাতে সে রাজি হচ্ছিল না। তাই তাদের হাত থেকে বাঁচার জন্য কোন রকমে নিজেকে উদ্ধার করেছি।  দার্জিলিং থেকে একটা ট্রেনে উঠেছিলাম,  সেখানে টিটিদের চোখ এড়িয়ে কোনো রকমে আজিমগঞ্জ পর্যন্ত এলাম। খুব খিদে পেয়েছিল। হাতে একটা টাকাও ছিল না। লোকাল ট্রেনে উঠলাম। নামলাম এখানে। উদভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। 


আমি বললাম -  আপনাকে তো সালার থেকে উঠে দেখলাম। 

ভদ্র মেয়েটা বললেন - “আজিমগঞ্জ থেকে উঠেছিলাম অন্য কামরায় ছিলাম। নেমে এই কামরায় এলাম। ভালো লাগছে না বুঝলেন মনের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব চলছে”। 


আমি বললাম  - আপনার বাড়ি কোথায়? 


মহিলা বললেন - “দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা।  দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা থেকে দার্জিলিং একজন নিয়ে গেছিল আমাকে হোটেলে কাজ দেবে বলে।  এক মাস কাজ করলাম জানেন। কিন্তু এক মাস পর থেকে আমাদের মত মেয়েদেরকে জোর করছিল কিছু অবাধ্য কাজ করার জন্য। আমি কিছুতেই রাজি হতে পারছিলাম না।  আমার মন আমার বিবেক কিছুতেই সায় দিল না। সুযোগ খুঁজছিলাম পালিয়ে যাবার তাই পালিয়ে এলাম”।  


আমি বললাম - যদি কিছু মনে না করেন আমি আপনাকে কিছু টাকা দিচ্ছি, দয়া করে কিছু খেয়ে নেবেন এবং বাড়ি ফিরবার সময় হয়তো গাড়ি ভাড়া টাও আপনার লাগবে।

 

তিনি আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমিও চোখটা ফেরাতে পারলাম না অনেকক্ষণ। দেখলাম তার মুখের মধ্যে রয়েছে যেমন সৌন্দর্য  তেমনি এক মায়াবী দৃষ্টি। সেই সৌন্দর্য আমাকে উতলা করল না বটে। কিন্তু মনের মধ্যে এই ভাবনা জাগ্রত হল যে কাটোয়াতে যদি আত্মীয়র বাড়ি খুঁজে না পায় তখন ? 

 

বললাম  - কাটোয়াতে আপনি চেনেন আপনার আত্মীয়র বাড়ি ? 


তিনি বললেন - “চিনি । স্টেশন থেকে হাটা পথ মিনিট দশ তো  লাগবে। আমি  চলে যাব”। 

 

আমি বললাম -  তার আর দরকার হবেনা।  দয়া করে আমি যে টাকাটা দিচ্ছি সেটা সঙ্গে রাখুন।  দান ভাববেন না। যদি কখনো আবার দেখা হয় তাহলে টাকাটা ফিরিয়ে দেবেন। বিনিময়য়ে আমি কিছু চাই না। ঠিক সেই সময় ট্রেনের হকার ভাই উঠলেন ঘুগনি নিয়ে।  আমি ঘুগনি নিলাম একটা উনাকে দিলাম।  দেখলাম খিদের জ্বালায় টপাটপ খেয়ে নিল আমারও যে খিদে পেয়েছিল।

 

খাওয়া শেষ হলে টাকাটা  আমি ওনার হাতে দিলাম বললাম - টাকাটা রাখুন যদি কখনো দেখা হয় তখন না হয় ফেরত দেবেন এখন যদি আপনি রাখেন আমি খুব খুশি হব।


তিনি কিছুটা দিধাগ্রস্থ হওয়া সত্ত্বেও টাকাটা আমি দিলাম।  হাত বাড়িয়ে টাকাটা নিয়ে বললেন  - “আবার কোথায় দেখা হবে জানিনা। তবে আপনার ফোন নাম্বারটা আমায় দিন আমি নিশ্চয়ই আপনাকে টাকাটা ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করব”। 


আমি বললাম - ফোন আছে আপনার কাছে?  তাহলে নাম্বারটা লিখে সেভ করে নিন। 

বললেন আমার ফোনটা ওরা কেড়ে নিয়েছে।  ব্যাগের থেকে একটা কাগজ আর পেন বার করে আমাকে নাম্বারটা লিখে দিতে বলল । নাম্বারটা আমি লিখে দিলাম উপরে নাম। 


তারপর বললাম আপনার নামটা যদি বলেন -  আসলে নামটা জানা হলো না তো তাই?  না বলেও ক্ষতি নেই। 


তিনি  আমার দিকে তাকিয়ে বললেন - “আমার নাম দেবিকা”। 


জলের বোতলে যেটুকু জল ছিল সেটাও এক নিমিষে শেষ করল। তারপর বোতলটা জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলল - “অনেক ধন্যবাদ আপনাকে জলটা দেবার জন্য। আসলে জল পিপাসাটা অনেকক্ষণ আগে পেয়েছিল। টাকা নেই বলে জলটা কিনে খেতে পারলাম না। “

ট্রেন চলছে তার আপন গতিতে।  এক ঘন্টার পথ সালার থেকে কাটোয়া।  আমি বললাম যদি কাটোয়াতে আপনার আত্মীয়রা চিনতে না পারে তখন।  

দেবিকা একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল -”আমার মাসির বাড়ি, মাসি নিশ্চয়ই চিনবেন। বছরখানেক আগেও তো একবার এসেছিলাম সুতরাং আশা করি খুব একটা অসুবিধা হওয়ার কথা নয়”। 


যাইহোক শুনে একটু আশ্বস্ত হলাম।  ট্রেনের হাওয়ায় দেবিকার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল।  পরনের কাপড়টা মাঝে মাঝে এদিক-ওদিক হচ্ছিল আর বারবার টেনে ঠিক করার চেষ্টা করছিল। ফর্সা গায়ের রং লম্বা ছিপচিপে চেহারা এবং সুন্দরী। 


বললাম  - আর কিছু যদি দরকার হয় ফোন করবেন? দ্বিধা করবেন না।  


দেবিকা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন -  নিশ্চয়ই করবো যে উপকার আপনি করলেন তাতে আমি খুব খুশি বাড়ি ফিরে নিশ্চয়ই আপনাকে ফোন করবো। 


এই ঘটনার পর গঙ্গার দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে।  বর্ষাকাল পেরিয়েছে দুর্গা পুজো চতুর্থী আজ। চারিদিকে পুজোর গন্ধ পুজোর আনন্দে মাতয়ারা সবাই। সকালবেলায় বসেছিলাম গঙ্গার ধারে। সন্ধ্যেবেলায় বেরিয়ে পড়বো দীঘা। দীর্ঘ কর্ম ক্লান্ত জীবনটাকে একটু বিশ্রাম দেওয়ার জন্য। সমুদ্রের ধারে বসে একটু খোলা বাতাস খেলে মনটা উদাস হয়ে যায়। হালকা হয়ে যায়। কর্ম ক্লান্ত জীবনের থেকে মাঝে মাঝে ছুটির ও দরকার হয়।  আমার কাছে পুজো তেমন একটা অর্থবহ কিছু বহন করে না। কারণ একাকি জীবনের একাকীত্ব আমাকে গ্রাস করে থাকে। তাই পুজোর কটা দিন বাড়ির বাইরে কাটিয়ে দিতে  পারলে বেশ ভালো লাগে। প্রতি বছর কোথাও না কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয়।  এ বছর দূরে কোথাও আর গেলাম না।  

গঙ্গার ধারে যখন বসেছিলাম তখনই একটা অচেনা নাম্বার থেকে ফোন এলো।  ফোনটা ধরতেই অপরপ্রান্ত থেকে একটা নারী কন্ঠে বললেন-  “আপনি অর্পণ বাবু  বলছেন তো?  আমি দেবিকা বলছি। ট্রেনে আপনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল মনে পড়ছে আমাকে”? 


আমি বললাম -  হ্যা মনে পড়ছে, অনেকদিন পরে ফোন করলেন।  তা বেশ মনে রেখেছেন এটাই যথেষ্ট। কেমন আছেন? কোথায় আছেন ?


দেবিকা বললেন - “অনেক কষ্ট করে টাকা জমিয়ে ফোনটা কিনলাম। তারপর প্রথম ফোনটাই আপনাকে করলাম।  জানি আপনি ভেবেছিলেন আমি অকৃতজ্ঞ। কিন্তু উপায় ছিল না”।

 

আমি বললাম - না না আমি কিছু ভাবিনি। আসলে আমার মনেও ছিল না কথাটা।  


দেবিকা বললেন- “আপনাদের মতন মানুষের কাছে সংসার কাজ আর এসবের মাঝে কোথাকার কোন মহিলা তার কথা কি মনে রাখা যায়? তবে আপনি যে আমাকে চিনতে পেরেছেন এজন্য আবারও ধন্যবাদ। আসলে আপনি সেদিন আমাকে ৫০০ টাকা দিয়েছিলেন। টাকাটা আপনাকে ফেরত দেবো”। 


আমি বললাম - তো বেশ তো অনলাইনে পাঠিয়ে দিও। 


দেবিকা বললেন - “অনলাইন নয়, যদি আপনি একটু আসতেন কোথাও তাহলে আপনার হাতেই টাকাটা দিতাম”। 

 

আমি বললাম  - দেখুন তাহলে পুজোর পরে একদিন দেখা করবো। অবশ্যই দেখা করব।  আজ আমি দীঘা চলে যাচ্ছি। 


অপর প্রান্ত থেকে দেবিকা বললেন  - “ফ্যামিলি নিয়ে বুঝি”?

আমি বললাম  - না একা।  আমার ফ্যামিলি নেই।  কেউ নেই।  যখন যেখানেই মনে হয় তখন সেখানেই চলে যাই। 

 

দেবিকা বললেন -”কালকে আমিও তো যাচ্ছি দীঘা”। 


আমি বললাম - বেশ তো, ঘটনাটা যদিও কাকতালীয় তবে দিঘাতেই দেখা হবে।  আমি আজ যাচ্ছি।  আপনি না হয় কালকে যাবেন।  


দেবিকা বললেন - আচ্ছা অখানে গিয়ে দেখা হবে। 


ফোনটা কেটে গেল।  সামান্য একটা ঘটনা তাই সেসব নিয়ে খুব একটা আগ্রহ যে আমার আছে তা নয়।  আমার আগ্রহ আমার নিজেকে নিয়ে। যাইহোক সেদিন সন্ধ্যেবেলায় দীঘা ট্রেন ধরলাম। রাত দশটায় গিয়ে পৌঁছালাম। হোটেল আগে থেকেই ঠিক করা ছিল তাই সমস্যা কিছু হলো না। 

ভোর বেলায় উঠে সমুদ্রের ধার ধরে হাঁটতে লাগলাম।  অনেক ভোর তখনও পূর্ব আকাশে রক্তিম সূর্যের দেখা মেলেনি। জলের ঢেউ পা’য়ের কাছ এসে আবার নেমে যাচ্ছে আপন ছন্দে। ভোরের বাতাসে একটু শীত শীত করছিল। 


আপন মনে হেঁটে চলেছি  বালুকারাশির উপর দিয়ে সমুদ্রের তীর ধরে। তারপর একটু একটু করে পূর্ব দিকে লাল আভা দেখা গেল। সেই লাল আভা সমুদ্রের উপরে যেন রক্ত ছড়িয়ে দিয়েছে।  সূর্যোদয় হল এক অপরিসীম সৌন্দর্য নিয়ে। আমি যেখানে গিয়েছিলাম হাঁটতে হাঁটতে সেটা অনেকটা নিরিবিলি এবং নির্জন একটা জায়গা।  একটা পাথরের উপরে বসে দেখছিলাম সূর্যের আলো কিভাবে সমুদ্রের জলের উপর খেলা করে।

যে পাথরের উপর আমি বসে ছিলাম সেই পাথরটার নিচে ঢেউগুলো আছড়ে পড়ছে আবার চলে যাচ্ছে অনেক দূরে।  এমনি করে সকাল কাটে।  তারপর একটা গাছ তলায় গিয়ে বসলাম। সমুদ্রের হাওয়ায় মনটা যেন উদাস হয়েছিল।  

গাছ তলায় বসে যখন সমুদ্রের ঢেউ দেখছিলাম ঠিক তখনই হঠাৎ কোথা থেকে আমার সামনে এসে দাঁড়ালো দেবিকা। হ্যা দেবিকাই তো।  খুব চেনা লাগছে। 


আমাকে দেখে বললেন - “আপনাকেই তো খুজছিলাম”।  


আমি তাকে দেখে অবাক হয়ে বললাম - আপনি যে  আজ ? 


কিছুটা অবাক হলাম । আবার বললাম -  আপনার বান্ধবীকে দেখছি না। 

 

তিনি বললেন -  “ঘুমিয়ে আছে। অনেক রাতে এসেছি তো।  আমি একাই বেরিয়ে পড়লাম। আপনাকে দেখে এখানে এলাম।  তাই আর ফোন করার দরকার হল না”। 


আমি বললাম - আসুন দুজনে মিলে একটু সমুদ্রের তীর ধরে হাঁটা যাক।  আর ওই যে দোকানটা দেখছেন ওখানে একটু চা খাব বুঝলেন।  কিছু যদি মনে না করেন তাহলে আসুন আমার সঙ্গে। 


দেবিকা বললেন -”মনে করার কিছু নেই চলুন”। 


চা জল খাবার খেয়ে হোটেলে ফিরলাম।  আর কাকতালীয়ভাবে দেবিকা ও একই হোটেলে আছে।  সে রয়েছে দোতালায় আর আমি রয়েছি তিন তলায়।  এতটা যে কাটতালীয় হতে পারে সেটা আমার ধারণা ছিল না।  


 দুপুরের খাওয়া শেষ করে নিজের ঘরে শুয়ে ছিলাম। সারাদিন অনেক হাটাহাটি হয়েছে। ভাবলাম একটু শুয়ে বিশ্রাম করি,  তারপর আবার বেরোবো বিকেলে।  রোদ টা একটু কমে গেলে সমুদ্রের ধারে গিয়ে বসবো। সমুদ্রের ধারে বসে বাদাম খেতে আমার ভীষণ ভালো লাগে। 

শুয়েছিলাম। যখনই দরজায় টোকা পড়ল।


দরজাটা খুলে দেখি,  দেবিকা। 


দেবিকা -  “আসতে পারি”?  


আমি বললাম - “আসুন না”। 


আমি বললাম - আপনার বান্ধবীকে নিয়ে আসলেন না।  তাকে তো দেখলাম না । 

দেবিকা হেসে বললেন -”আমাকে দেখে ভালো লাগছে না বুঝি?  


এবার আমি হেসে বললাম - আরে না,  সেসব না।  আপনি বললেন আপনার বান্ধবীকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন, তাই ভাবছিলাম।  যাক সে আপনার বান্ধবী যেখানেই যাক আমার কোন সমস্যা নেই।  বলুন হঠাৎ কি মনে আমার ঘরে। 


দেবিকা -  “টাকাটা দিতে”।

 

আমি হেসে বললাম  - এ টাকাটার জন্য দেখচ্ছি আপনার ঘুম হচ্ছে না। 


দেবিকা  আমার হাতে একটা ৫০০ টাকার নোট ধরিয়ে দিয়ে বললেন  - ঋণ মুক্ত হলাম। রাখুন। 


দেবিকা  আমার বিছানার এক প্রান্তে আর আমি অপরপ্রান্তে। কথা বলতে বলতে কারেন্ট চলে গেল। সমুদ্রের দিকে জালনাটা খুলে দিলাম।  দেবিকা বললেন - “দূর থেকে সমুদ্রের গর্জন আসছে তাই না।  কি অদ্ভুত কি অপূর্ব আচ্ছা সন্ধ্যেবেলায় কি করছেন আপনি”? 

আমি বললাম  - আমার কোন কাজ নেই।  সন্ধ্যেবেলায় সমুদ্রের ধারে বসে একাকী বাদাম ভাজা খাওয়া ছাড়া আমার আর কোন কাজ নেই। এতেই আমার শান্তি। 


দেবিকা বললেন - “আমি যদি আপনার ওই বাদাম ভাজার আসরে যোগ দিই খুব সমস্যা হবে কি”? 


আমি বললাম - না,  সমস্যা আর কিসের। কোন সমস্যাই হবে না। 


রাতের বেলা একটু আরাম করে শুয়েছি। ঠিক তখনই আবার কড়া নাড়ার শব্দ।  বুঝলাম যে দেবিকা।  কিন্তু এত রাতে দেবিকা আমার ঘরে কেন?  

আবার কড়া নড়ে  উঠল,  একবার,  দুবার, তিনবার। বাধ্য হয়ে দরজাটা খুলে দিলাম।  দেখলাম সত্যিই দেবিকা। 


আমি বললাম - এত রাতে আমার ঘরে?

 

দেবিকা বলল - “আসলে আমার এই বান্ধবীটাকে না খুঁজে পাচ্ছি না কোথায় যে গেল।  আর আমিও ভয়ে একা থাকতে পারি না। আচ্ছা আপনার এখানে যদি একটু বসি অসুবিধা হবে”?

 

তাকে বসতে বলেই আমি দরজাটা বন্ধ করলাম।  তারপর আবার আমি আমার জায়গায় এসে শুয়ে পড়ব ভাবছিলাম কিন্তু একজন মহিলাকে বসিয়ে আমি নিজের শুয়ে থাকব সেটা কেমন একটা লাগছে।  যাই হোক সেই রাতে দেবিকা বললেন তার কথা।  তার পরিবারের কথা।  কথা বলতে বলতে তার চোখে জল।  আর সেই জল টপ টপ করে এসে পড়ছিল বুকের উপর।  আচলটা একটু একটু করে ভিজে যাচ্ছিল।  দেবিকা বলে যাচ্ছিল তার কথা। তখনই কারেন্টটা চলে গেল। দেবিকা বললেন এখানেও কারেন্ট চলে গেল 

আমি বললাম - ভয় নেই চলে আসবে, বসো।

দেবিকা বললেন -”অন্ধকারে আমার ভীষণ ভয় ছিল জানেন”।


আমি বললাম এখন আর ভয় পান না 


দেবিকা বললেন -”আমি তো অন্ধকারেই থাকি।এখন তো আর অন্ধকার কে ভয় পাই না।  অন্ধকারই আমার জীবন”।

 

কথাটা ঠিক বুঝতে পারলাম না। অন্ধকারে থাকি মানে। 


বললাম - অন্ধকারে থাকেন মানে? 

দেবিকা একটু হাসলো মনে হল।  অন্ধকারে এসে হাসির রেশ কতটা তা বোঝা গেল না। 

দেবিকা বললেন - “আসলেই ভয় পেতাম। এখন তো অন্ধকারই আমার বাস। তাই আর ভয় পাই না”। 


আমি বুঝতে পারলাম না। বললাম - অন্ধকারে বাস করেন কেন? আপনাদের কি কারেন্ট নেই ওখানে? আপনাদের গ্রামে কি কারেন্ট পৌঁছায়নি?

 

দেবিকা বললেন - “আছে। সব আছে। আলো ঝলমলে একটা গ্রাম। একটা ঘর সব।  শুধু নেই আমি। 


আমি বললাম - আপনি নেই মানে?  আপনি তো আছেন।  আপনি কি আপনার বাড়িতে থাকেন না? 

 

দেবিকা বললেন  - সব জায়গায় আমার ঘর।  যখন যেখানে থাকি তখন সেটাই আমার ঘর। এই ধরুন এখন এখানে আছি এটাই আমার ঘর?


কথা টা  বলে একটু হাসলো। সে হাসিটা সাধারণ মানুষের মতো নয়। কতকটা বিশ্রী টাইপের।  কারেন্টটা তখনও এলো না। ফোনের আলো টা জ্বালাতে যাচ্ছিলাম।


দেবিকা বললেন - “আরে থাক আলো জানানোর দরকার নেই”। 


আমি বললাম -বেশ তবে জানালাটা খুলে দিই আলো আসবে।  


আমি জানালাটা খুলতে চাচ্ছিলাম ঠিক তখনই একটা শক্ত হাত আমাকে টেনে ধরল। সে হাতটা মানুষের হাত নয়। শুধু টেনে ধরল না। এমনভাবে চেপে ধরল যে তার হাত থেকে আমি কিছুদিন ছাড়াতে পারছিলাম না।  


আমি বললাম - “দরজা জানালা খুলে দি”। 


দেবিকা বললেন - “না।  বসুন এখানে”।


আমাকে টেনে বসিয়ে দিল।  আর ঠিক সেই সময় কড় কড় হড় হড় শব্দ  হল। মনে হচ্ছিল একটা হাড়ের সঙ্গে আরেকটা হার লাগলে যে শব্দ হয় ঠিক তেমনি। ঘরটা এতটাই অন্ধকার ছিল যে কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। যখন শুয়েছিলাম তখন ফোনটা সামনের ড্রয়ারে রেখেছিলাম। এখন আর সেই ফোনটা বের করতে যাওয়ার জায়গা নেই।  


দেবিকা বললেন - “চুপ করে বসুন”। কিছু  কথা আছে শুনুন।  


আমি বললাম  - দিনের বেলায় তো বলতে পারতেন?  এখন একটু ঘুমাতে দিন না আমায়।


দেবিকা আবার সেই বিশ্রী রকমের হাসিটা হেসে বললেন - “ ঘুমাতে দেবো নিশ্চয়ই। কিন্তু আমাকে যারা ঘুমাতে দেয়নি তাদের কেউ তো ঘুমাতে দিতে পারি না তাই না”? 

ঠিক তখনই কারেন্ট এলো, এবং মুহুর্তের মধ্যে দেখলাম আমার সামনে বসে রয়েছে একটা কঙ্কাল। 


আমি অজ্ঞান হয়ে পড়লাম। তারপর আর কিছু মনে নেই।  যখন একটু হুশ ফিরলো তখন দেখলাম ঘরে আলো জ্বলছে বটে কিন্তু আমার ঘরে কোথাও কেউ নেই।  আর তার থেকেও আশ্চর্য কথা ঘরটা ভেতর থেকে বন্ধ করা। দেবিকা কি বেরিয়ে গেল, বুঝতে পারলাম না।  সাহসের উপর ভর করে চারিদিকে তাকালাম। কিন্তু কোথাও তাকে দেখতে পেলাম না। 


ওয়াশ রুমটা খুলতে ভয় লাগছিল কিন্তু সেটাও তো বাইরে থেকে বন্ধ  করা।  ভিতরে তো কেউ নেই। 


একবার ডাকলাম দেবিকা দেবিকা।  কোন সাড়া মিলল না। টেবিলের উপর দেখলাম একটা কাগজ। কিছু একটা  লেখা আছে । 


লেখাটা পড়তে লাগলাম। 


“মহাশয়, 

 আপনি যে দেবিকাকে দেখছেন সে মানুষ নয়।  সেদিন ওই ট্রেনে ফেরার পথে আমি কাটোয়া যখন নামলাম তখন অনেকগুলো ছেলে রাস্তা থেকে আমাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। তারপর আমার সর্বনাশ করে আমাকে মেরে ফেলে দিল ওই জঙ্গলে। আপনার উপকার আমি ভুলিনি।  আপনাকে টাকাটা কিভাবে দেবো সেটাই ভাবছিলাম।  আমার বন্ধুর নাম্বার থেকে আপনাকে ফোন করেছিলাম। আমার বন্ধু জানে না।  আমার বন্ধু কিন্তু আপনার নিচের তলায় রয়েছে। আসলে যারা আমাকে মেরেছিল আমি তাদেরকে খুঁজছিলাম। আজ সকালে ওরা সবাই মিলে এসেছে দীঘায়।  একটু আগে ওদের সবাইকে মেরে রেখে এসেছি। ভয় নেই ওরা এখান থেকে ১০০ মিটার দূরে একটা হোটেলে ছিল।  জঙ্গলের মধ্যে পচা গলা  অবস্থায় পড়েছিলাম আমি। আমার বাড়ির লোক কেউ জানে না যে আমি মৃত। আমি খুঁজছিলাম প্রতিশোধ নেবার মুহূর্ত।  সুযোগ এসে গেল, সবাইকে একসঙ্গে পেয়ে গেলাম। কালকে সব খবরে নিশ্চয়ই শুনবেন।  কিন্তু কে এমন ভাবে মেরেছে কেউ জানতেই পারবে না।  ওরা ওই সমুদ্রের ধারের একটা নির্জন জায়গায় বসে মদ্যপ অবস্থায় ছিল,  ঠিক সেই সময় আমি ওদের সামনে গিয়ে পড়ি।  তারপর এক এক করে শেষ করে দিয়েছে সবাইকে। আচ্ছা আর একটা চিঠি আমি লিখে রাখলাম টেবিলের উপরে।  দেখুন ওই চিঠিটা যে কোন পোস্ট অফিস থেকে আমার বাড়িতে পাঠিয়ে দেবেন। আমি যে বেঁচে নেই তারা জানুক। আর হ্যাঁ আপনার সামনে আর কখনো আসবো না।  আমাকে ভয় পাবেন না। আপনার টাকাটা বাকি ছিল তাই শোধ করে গেলাম।

বিদায়”। 


আমার হাত পা,  শরীর থর থর করে কাঁপছিল। এমন ঘটনার সম্মুখীন যে আমাকে হতে হবে তা ভাবিনি।  একটা খাতার তলায় আরেকটি চিঠি পেলাম।  কি লেখা ছিল তা আমি জানিনা।  চিঠির পাশে যে ঠিকানা লেখা ছিল সেই ঠিকানায় পরের দিন সকালে দীঘা থেকে পোস্ট করে দিলাম।  পরের দিন সন্ধ্যেবেলায় যখন দিঘার ধারে বসে ছিলাম তখন একদিক থেকে ভেসে আসছিল ঢাকের শব্দ,  শঙ্খের ধ্বনি, উলুধ্বনি আর একদিক থেকে ভেসে আসছিল সমুদ্রের গর্জন। সেই অন্ধকার তমসাচ্ছন্ন সমুদ্রের মাঝে যেন দেখতে পেলাম দেবিকাকে,  সে আস্তে আস্তে সমুদ্রের মধ্যে মিলিয়ে যাচ্ছে। 


Post a Comment

You are Welcome to the Kotha Koli

Previous Post Next Post