অতনু সরকার
আমি শ্রী সায়ন সরকার। অনেক উত্থান আর পতন আমার জীবনের উপর দিয়া বহিয়া গিয়াছে। সেই কোন ছোট বেলায় বাবা-মা কে হারাইয়াছিলাম। তাহার পর বৌদির কাছে মাতৃ স্নেহে মানুষ হইয়াছি। আমার আছে সে দেবী। আমি মনে মনে তাহাকে পূজা করি। শুধু আমি নই আর এক জনও বৌদি কে পূজা করে সে আমার দিদি, শ্রেয়া। সেও তো-আমার মতো বৌদির আঁচলের তলায় মানুষ। য়ামাদের জন্য বউদি দেরি করিয়া মা হইয়াছে। তাহার এক মাত্র কন্যা সোনা অর্থাৎ সুলগ্না এমন চার বছরে পড়িয়াছে। সোনা সর্বদা আমার কাছে থাকে। আমি বড়দার মতো ব্যবসা করিতে চাহিনা, মেঝদা বা ছোটদার মতো চাকারী করিতেও চাহিনা। আমি ফুটবল খেলি। আমি খেলয়ার হইতে চাই।
বর্ষা
কাল আমি আমার ঘরে বসিয়া পড়িতেছি। আমার পড়ার ঘর এমন নীচে। বড়দা উপরের ঘর
ছাড়িয়াছে। বড়দা স্বেচ্ছায় মেঝদা আর ছোটদাকে উপরের ঘর ছাড়িয়া নীচে আশ্রায়
করিয়াছে। একদিকে বড়দার ঘর আর এক দিকে আমার।
আমি
বসিয়া পড়িতেছি আর আমার পাশে বসিয়া সোনা একটি ছেড়া খাতা লইয়া খেলা করিতেছিল।
বাইরে অবিশ্রান্ত বৃষ্টি পড়িতেছে। বৌদ আর ছোটবৌদি রান্না করিতেছে। মেজবৌদি তাহার
এক দুরসম্পর্কের দাদার সহিত উপরে বসিয়া গল্প করিতেছে। এই প্রথম সেই ব্যক্তি আমাদের
বাড়িতে আসিয়াছে। আমি অঙ্ক করিতে করিতে একবার উপরে গেলাম ক্যালকুলেটার লইতে।
কিন্তু মেঝবৌদির একটি কথা কানে আসিতেই দাঁড়াহিয়া পড়িলাম। মেজ বৌদি আর তাহার সেই
দাদার কথা বার্তা এইরূপ মেজবৌদি - অপু তোমাকে ছাড়া আমি কি করে বাঁচব বল।
অপু- সেই জন্যই
তো আমি এসেছি রূপা।
মেঝবৌদি-
কিন্তু অনেক দেরি করলে অপু।
অপু-
আমি যে নিরুপায় ছিলাম রূপা।
মেজ -
এখন তুমিই বা কি করবে আর আমিই বা কি করতে পারি বল।
অপু-চল
আমরা পালিয়ে যাই।
মেজ -
সে হয়না, আমার মনি রয়েছে। আর তাছাড়া ও আমার সঙ্গে
এমন কোন ব্যবহার করে না যে যার জন্য ওকে ছেড়ে যেতে হবে।
অপু-
তবে আমি আর আসব না?
মেঝ
-হ্যাঁ, আর এস না।
মেঝবৌদি তাহার পর কিছুক্ষণ চুপচাপ। আমি বুঝিলাম পূর্ব প্রেমিকা।
কিন্তু মেঝদার সঙ্গে ও প্রেম করিয়া বিবাহ হইয়াছে। কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না। হঠাৎ
আবার শুনিলাম, সেই পুরুষ বলিতেছে -আমি আর আসব না যদি তুমি আমায় দশ হাজার টাকা দাও।
মেঝ-
আমি! আমি কি করে দেব।
অপু-তোমার
স্বামী ভাল চাকরী করে।
ম্যানেজ কর।
মেজ
-আমার কাজে তো কোন টাকা থাকে না।আর যদি না দিই তুমি কি করবে?
অপু-
তোমার দেওয়া চিঠি গুলো তোমার স্বামীর হাতে দিয়ে দেব। তোমার বাড়ির লোক বুঝতে মে
তুমি....
মেঝ-চুপ
কর। আগে জানলে তোমায় ঢুকতে দিতাম না বাড়িতে।
অপু-
এমন উপায় নেই বল!
মেজ-
আমায় ক্ষমা কর অপু। আমি পারব না।
অপু-তাহলে
তো চিঠি..
মেঝ -
না অপু তুমি আমার সোনার সংসারে আগুন দিয় না।
অপু-
তবে টাকাটা জোগার কর। আমি আর দেরি করব না।
এই টুকু
শুনে একরাশ ঘৃণা লইয়া আমি নীচে আসিয়া বিছানায় শুইয়া পড়িলাম।
সোনা
মেলা করিতে।
আমি
বৌদিকে ডাকিলাম।ভাবিলাম বলিব,
কিন্তু কি বলিব?
বৌদি আসিল।আমি সব সঙ্কোচ দূর করিয়া বৌদিকে সব ঘটানা
বলিলাম। বৌদি শুনিয়া কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল- আমার গা ছুয়ে বল তুই কাউকে এই
কথা বলবি না।
আমি
অবাক হইয়া বলিলাম- বেশ বলব না।
বৌদি-
মনে থাকে যেন।
আমি -
থাকবে।
বৌদি
চলিয়া গেল। তাহার কিছু সময় পর
দেখিলাম সেই লোকাটি ও চলিয়া গেল। হ্যাঁ সেই বৃষ্টির মধ্যেই চলিয়া গেল।
সে
সেদিন রাতেই শুনিলাম মেজদার দশ হাজার টাকা চুরি হইয়া গেছে। বাড়ি হইতে দশ হাজার
টাকা কি করিয়া চুরি হইয়া গেল তাহা লইয়া মেলা হইচই বাঁধিয়া গেল। সকলের সন্ধেহ
অবশ্যই আমার উপর। এক মাত্র বৌদিই জানিল যে আমি চুরি
করি নাই। আমি আএ বৌদি জানিলাম টাকা কে
লইয়াছে আর কি কাজে লাগিয়াছে। রাতে
আমাকে লইয়া বেশ এক দফা জেরা চলিল। এমন কি ছোট বৌদি ও আমার হইয়া বলিল, যে সে ও আমাকে উপরে যাইতে দেখে নাই। আর বড় বৌদি তো আমার
পক্ষেই আছে। সুতরাং আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ টিকিল না।
দু-একক
জন অবশ্য সেই অপরিচিতর উপর সন্দেহ
করিল। এই ঘটানার পর হইতে মেঝদা আর মেঝবৌদি আমার
সহিত ঠিক মতো কথা বলিত না। অবশ্য তাহাতে আমার কোন যায় আসে না।
আর
একদিন আর একটি ঘটনা ঘটিল। আগের দিন অনেক রাত করিয়া কলকাতা হইতে ফিরিয়াছি। খেলা
ছিল বলিয়া ফিরিতে দেরি হইয়া ছিল। সেদিন আমি একটি সুন্দর উপহার পাইয়া ছিলাম। একটি
সুন্দর কাচের বাক্সের মধ্যে একটি-সুদৃশ্য সোনার রথ। রাতে দেখাইতে পারিনি বলিয়া
সকালে সকলকে দেখাই বার জন্য ডাকা ডাকি করিয়া জড় করিয়া সিঁড়ি দিয়া নামিতে ছিলাম।
মেঝবৌদির দেরি দেশিয়া আমি তাহার কাছে গিয়া তাহার হাতের কাজটি কাড়িয়া লইয়া তাহার
হাত ধরিয়া বলিলাম- মেজবৌদি আগে চল দেখবে চল। মোবৌদি চিৎকার করিয়া আমার হাত ছাড়াই
লইয়া আমার গালে একটি চড় মারিয়া বলিল- লজ্জা
কারে না মেয়েদের গায়ে হাত দিতে।
আমি
বিস্ময়ে দাঁড়াইয়া রইলাম। ছোট বৌদিও এই ঘটনা দেখিয়াছিল। সে সিঁড়ির মুখেই
দাঁড়াইয়া পড়িল। আমি মাথা নত বারিয়া নীচে আসিলাম।
কিছুক্ষন
পর মেজবৌদি সকলের সম্মুখে আসিয়া বলিল- তোমার লজ্জা করে না ঠাকুর পো বৌদির হাত ধরে
টানতে।
বড়বৌদি
বলিল- কি করেছিস রে?
আমি সব
বলিলাম। আর বলিলাম ছোট বৌদিও দেখেছে।
মেঝবৌদি
আমার কথায় রাগিয়া বলিল-বাড়ির অন্ন ধ্বংস করছ আর বৌদির হাত ধরে টানাটানি কর। আয় করার মুরদ নেই।
আমি
আমার অন্যায় বুঝিতে পারিলাম না।
নিজের
বৌদিকে নিজের পাওয়া একটা উপহার দেখাইব বলিয়া আবদার করিয়া তাহার হাত ধরিয়া এ কি
বিপদে পাড়িলাম।
মেঝ
বৌদির কথা শুনিয়া ছোট বৌদি ঘর ছারিয়া চলিয়া গেল। পাছে তাহাকে সত্যটা বলিতে হয়।
মেঝদা, বড়দাকে বলিল-দাদা এই ভাবে তো চলা যায় না।
আজ টাকা চুরি, কাল এই অপমান, আর ও না জানি কি হবে।
ছোটদা
বলিল- বাড়ি থেকে বার করে দাওনা।
বৌদি
মাঠা নীচু করিয়া শুনিল, বুঝিতে পারিল।
আমি এক বার তাহার দিকে চাহিলাম সে চুপ থাকিতে বলিল। তাহার ইশারার চুপ করিয়া রইলাম।
মেজবৌদি আমার দিকে বিষ নজরে চাহিয়া ঘর ছাড়িল। বড়দা বলিল- আজ রাতে একটা আলোচনা করা
যাবে।
সবাই
চলিয়া গেল। বড় বৌদি আমার কাছে আসিয়া আমার দুই গালে দুইটি চড় মারিয়া বলিল- কেন
তুই ওর হাত ধরতে গেলি?
দুজনের
চোখেই জল ঝরিতেছে। বোধ করি বৌদির একটু বেশি জল ঝরিতেছে।
বৌদি
আবার বলিল- তুই জানিস না ও কেমন?
আমি-
বুঝতে পারিনি অতটা হবে। আর মেঝ বৌদি যে বাজে...
বৌদি -
চুপ কর। আমার সব চেনা হয়ে গেছে। কেন তুই যাবি ওদের কাছে! তো তুই আমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে
পড়িস, জিতলে আমায় জড়িয়ে ধরে আদর করিস কই আমি
কিছু বলি?
আমি-
মেঝ বৌদি যে ওরকম করবে
বৌদি-
অথচ ওর চুরির দায়, তুই মাথায় নিয়েছিস।
বলিয়া
আমাকে নিজের বুকের কাছে টানিয়া গালে হাত বুলাইতে বুলাইতে বলিল- খুব লেগেছে রে। আর
কখনও যেন ওদের কাছে যাস না।
আমি
বলিলাম- না যাব না।
তুমি
আমার মা তোমার কাছেই থাকব।
বৌদি -
ধুর বোকা আমি তোর বৌদি না।
বড়দা
আমাদের দিকে চিহিয়া রহিল, বোকার মত।
তাহার চোখও চলছল করিতেছিল।
