১৩ তম পর্ব
আমি কিছুতেই বুঝিতে পারিতেছিলাম না আমার এই পতনের কারণ কি হইতে পারে। আমার মনের কথা বলিবার কেহ নাই। বহুদিন পর সমরের কথা মনে পড়িল। তাই রাতে বসিলাম তাহাকে একটি পত্র লিখিতে।রাতে বসিয়া পত্র লিখিতেছি এমন সময় অন্দর মহলের দিকের দরজার কড়া নড়িয়া উঠিল। আমি পত্র খানি লুকাইয়া দরজাটি খুলিয়া দেখিলাম স্বয়ং বৌদি।
বৌদি ঘরে ঢুকিয়াই দরজা বন্ধ করিয়া দিল তাহার পর খাটের উপর বসিল। আমি তাহার পাসে গিয়া বসিলাম। বৌদি আমার মাথায় হাত বুলাইতে লাগিল। আজ আর আমি ছোট নই। তবুও সেই আগের মতো আদর পাই। হঠাৎ কেন জানি না আমার দুই চোখ বাহিয়া জলের ধারা নামিল। বৌদি তাহার আঁচল দিয়া আমার চোখ মুছাইয়া দিয়া
বলিল-কি হয়েছে তোর, খেলতে পারছিস না। কোন কোন দিন রান্না করিস না। নদীর ধারে রাত কাটাস কেন! কি হয়েছে বল?
আমি-জানি না বৌদি। আমি নিজে হারিয়ে ফেলছি।
বৌদি আমার মাথাটা নিজের কাছে টানিয়া লইয়া আদর করিতে করিতে বলিল- ক’দিনে বেশ রোগা হয়ে গেছিস। আমাকে বল না কি হয়েছে।
আমি- কি বলি তোমায়। আমি যে নিজেই কিছু বুঝতে পারছি না।
বৌদি- কাউকে ভালোবেসেছিস না নাকি। কাউকে ভালো লেগেছে তোর?
আমি-তুমি কি করে জানলে?
বৌদি - তোর বয়স তো আমি পেরিয়ে এসেছি। সেই ছোট থেকে মানুষ করেছি তোর মনের কথা বুঝব না আমি।
আমি বৌদিকে সব কথা খুলিয়া বলিলাম। বর্ষার কথা বলিলাম। তাহাকে ভালো লাগার কথা বলিলাম।
বৌদি শুনিয়া হাসিয়া বলিল- শোন তুই কাল একবার যাবি ওদের বাড়ীতে না হয় কাউকে দিয়ে তাকে খবর পাঠাবি।। তার পর ওকে সরা সরি বলবি যে তুই ওকে ভালবাসিস।
আমি-কাল! কিন্তু …?
বৌদ - ও তো কলেজে পড়ে। কলেজ থেকে ফেরার পথে ধরবি। ওর সঙ্গে তো পরিচয় আছে সমস্যা নেই।
আমি-সে ঠিক আছে। কিন্তু রাস্তায়…
বৌদি- আচ্ছা বলেই দেয় না। প্রেম তো খারাপ কিছু নয়। প্রেম যে পবিত্র।
আমি- তোমার ও কি এমন হয়েছিল বৌদি?
বৌদি - হ্যাঁ হয়েছিল। যেদিন প্রথম তোর বড়দা কে দেখি সেদিন।
আমি-- কিন্তু বৌদি বর্ষা যদি খারাপ কিছু ভাবে।
বৌদি- তুই আগে বল। না হয় আমি গিয়ে দেখা করবো। তুই যদি না পারিস তো বল আমি যাই। একটা মেয়ে কে ভালোবাসিস সেটা বলার ক্ষমতা নেই তোর? আচ্ছা আমি যাব কি? । তোর এই অবস্থা আমি আর মানতে পারছি না।
কথা গুলি শেষ করিয়া বৌদি চলিয়া গেল। আমি ভাবিতে লাগিলাম সত্যই বড়দার বৌ আমার মাতৃসমা বৌদি শুধু নয় প্রিয় বন্ধু ও বটে। না হইলে আমার মনের কথা বুঝিয়া এমন কথা বলে কেউ। রাতে ঘুমাইতে পারিলাম না। বিছানায় পড়িয়া শুধু ভাবিতে ছিলাম বর্ষা কে আমার মনের কথা বলিব। কোন কথা দিয়া যে শুরু করিব। ভোরেরব দিকে কখন জানিনা ঘুমাইয়া পড়িয়া ছিলাম।
যথা সময়ে যথা স্থানে গিয়া দাঁড়াইলাম।
একটি ফোনে দোকানে গাড়ি রাখিয়া কিছু একটা কিনি বার ছলনায় দোকানে ঢুকিয়া পড়িলাম। বেশি ক্ষন অপেক্ষা করিতে হইল না। এবং আমাকেও প্রথমে কোন কথা বলিতে হইল না। বর্ষা একাই বাস ধরিবার জন্য আসিতে ছিল।
আমাকে দেখিয়া বলিল-এই যে শুনছেন।
আমি তাহার ডাকের অপেক্ষাই করিতে ছিলাম। তাহার ডাক শুনিয়াই বলিলাম - কালেজ থেকে ফেরা হচ্ছে বুঝি।
বর্ষা- হ্যাঁ, আপনি।
আমি যে তাহার জন্যই আসিয়াছি তাহা বুঝিতে না দিয়া দোকান হইতে সামান্য একাটা মাল লইয়া বলিলাম- এই একটু দোকানে এলাম। দাঁড়ান আসছি।
বর্ষা দাঁড়াইয়া গেল। আমি একটি ফুলদানী লইয়া তাহার কাছে আসিয়া বলিলাম - আপনার কি একটু সময় হবে?
বর্ষা-তাহার হাতের ঘড়িটি দেখিয়া বলিল- হবে।
আমি- তাহালে আসুন।
বর্ষা - কোথায়?
আমি- এই একটু গঙ্গার ধারে বসব। বিছু কথা আছে।
বর্ষা- চলুন।
চুঁচুড়ার ফেরি ঘাটের পাশে আসিয়া আমরা থামিলাম। একটি গাছ তলায় বসিয়া প্রথনে দুজনে কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিলাম।
তাহার পর আমি মন কে শক্ত করিয়া বলিলাম- শুনুন আপনাকে আমার একটি কথা বলার আছে। যদি ভালো না লাগে রাগ করবেন না কিন্তু।
বর্ষা- আগে বলুন। রাগ করার কথা আসছে কেন?
আমি ও তাহার আচারণে বুঝিলাম আমার প্রতি তাহারো একটা দুর্বলতা রহিয়াছে। আমি একটু ভাবিলাম তাহার পর বলিলাম- বর্ষা আমি আপনাকে ভালোবাসি।
বর্ষা শুনিয়া একটু হাসিল। তাহার চোখের তারায় একটা আনান্দের তরঙ্গ প্রবাহিত হইয়া গেল। তাহার সমস্ত শরীরের রোম গুলি শিহরিত হইয়া উঠিল। প্রথমে বর্ষা কি বলিবে তাহা আমি অনুধাবন করিতে পারিলাম না। আমি তাহার মুখের দিকে চাহিয়া ছিলাম। বর্ষাও একবার আমার দিকে চাহিল। দুজনের চোখ একই পথ নিবদ্ধ হইয়া আবার সরিয়া গেল।
অল্প কিছুক্ষণ ভাবিয়া বর্ষা বলিল- তাহলে আগে তুমি বল।
আমি- আমি তোমায়……
বর্ষা বলিল-অমি তোমায় প্রথম দিনই ভালোবেসে ফেলেছিলাম।
আমি বলিলাম -সত্যি?
বর্ষা আমার হাতটি তাহার হাতের মধ্যে লইয়া একটু হাসিয়া বলিল- সত্যি- গো সত্যি।
আমি- আজ থেকে আমরা দুজন, দুজনার শুধু দুজনার।
বর্ষা- এই ভালোবাসা থাকবে তো, চিরদিন। আমার কপালে সুখ সইবে কিনা জানি না।
আমি- তুমি আমায় বিশ্বাস কর।
বর্ষা- করলাম। আর করবো চিরদিন।
আমি- তোমার কথা ভেবে জান আমার কয়েক দিন যে কি ভাবে কেটেছে না। বৌদি না বললে আমার যে কি হতো!
বর্ষা- কেন হয়েছিল?
আমি আমার সমস্ত হতাশা, আমার জীবনের দুশ্চিন্তা এবং সর্বপরি আমার খেলার অবনতি হইতে গত কাল রাতে বৌদির সহিত আমার সব কথা তাহাকে বলিলাম।
শুনিয়া বর্ষা বলিল- তোমার বৌদি কে আমার প্রনাম জানিও। ধন্যবাদ দিয়ে তাকে ছোট করতে চাই না।
আমি- এই শোন, আজ বিকালে চল না কোথায়ও একটু বসব।
বর্ষা-আমাদের কুন্তির ধারেই বসব।
আমি- তুমি কোথায় আসবে?
বর্ষা- যেখানে তোমাতে আমাতে প্রথম ধাক্কা লেগেছিল ওখানে।
আমি- সেদিন আমার বুকেও কি কম ধাক্কা লাগেছিল।
বর্ষা- সে ব্যাথা এমনও আছে নাকি?
আমি- ছিল। এই মুহুর্তে আর নেই।
বর্ষা- চলো। এবার কিন্তু দেরি হবে।
এক অনাবিল আনন্দ লইয়া আজি বাড়ি-ফিরিলাম। আজ মনে হইতেছে আমি বোদ হয় কোন যুদ্ধ জয় করিয়া আসিয়াছি। মনের আনন্দে জ্ঞান ধরিলাম যাতে বৌদির কানে যায়।
