১৪ তম পর্ব
যে আমি খেলা হইতে হারাইয়া গিয়াছিলাম সেই আছি এক সপ্তাহের ছুটি কাটাইয়া যখন ক্লাবে যোগ দিলাম তখন আমার মধ্যে আর কোন গ্লানি রইল না। অবশ্য ইহার মধ্যেই বর্ষার সহিত আমার নতুন সম্পর্ক স্থাপিত হইয়াছে। তাহা আপ্নারা জানেন।
আমি মাঠে নামিলাম। আর সেদিন ক্লাবের সদস্যরা এবং দর্শক পর্যন্ত অবাক হইয়া গেল আমার প্রত্যাবর্তন দেখিয়া। খেলার শেষে গলায় উঠিল ফুলের মালা। এই রকমই হয় খেলায়ারদের জীবন। ভালো খেলিলে ফুল আর খারাপ খেলিলে জুতো। পরের দিন আবার কাগজে আমার ছবি, বাহির হইল। এই সামাল্যের পর আর আমার পিছনে ফিরিয়া তাকাইতে হইল না। জেলা লিগের খেলাতেও এ আবার আমি নিজেকে মেলে ধরিলাম অন্য রুপে। আর আমার এই সফল্যের জন্য যে বেশি খুশি হইয়াছে সে আমার বৌদি। আর যাহার জন্য আবার নিজেকে ফিরিয়া পাইয়াছি সে বর্ষা।
এখন প্রতি খেলার আগের সন্ধ্যায় বর্ষা সহিত দেখা করা আমার রুটিন হইয়া গেল, সে আমায় উৎসাহ দেয়, প্রেরণা দেয়। প্রতিদিন নতুন নতুন উৎসাহে আমি মাঠে নামিতে পারি। বর্ষা যখন আমার ললাটে দীর্ঘ চুম্বন করিয়া বলে- কাল তোমায় আরো ভালো খেলতে হবে, তখন শরীরে ক আলাদা শিহরণ জাগে। তখন তাহার এই কথা শুনিয়া আমার রক্ত চঞ্চল হইয়া ওঠে। শক্তি দ্বিগুন হইয়া যায়।
আমি এখন কলকাতার বড় ক্লাবে খেলি। আমার এখন অনেক নাম। কিন্তু কেহই জানে না যে আমার এই নামের পিছনে দু-জন নারীর অবদান আমি কোন দিনই ভুলিতে পারিব না। বৌদি আর বর্ষা আমার জীবনের বড় পাওনা। একজন মা না হইলে ও মায়ের মতো আর একজন বর্ষা। আমার দুঃখ ও সুখের সাথী। আরো একজন আছে, সে আমার শ্রেয়াদি। তাহার সহিত কথা হয় নিয়মিত। কখনো আমি তাহার সহিত দেখা করি তাহার বাড়ীতে আসি, কিন্তু সব সময়ে সম্ভত হইয়া ওঠে না।
বিকালের রৌদ্র পড়িয়া আসিয়াছে। আমি আর বর্ষা দুজনে নির্জন কুন্তী নদীর ধার দিয়া হাঁটিয়া চলিয়াছি। অনেক ক্ষন ধরিয়া হাঁটিতে ছিলাম। কেউ কোন কথা বলিতেছিলাম না। দুজন দুজনের হাত ধরিয়া চলিতে লাগিলাম।
হাঁটিতে হাঁটিতে আমি বলিলাম - তোমার পরিক্ষা কবে?
বর্ষা - সামনের মাসে।
আমি- তাহলে তো দুজনের ঘোরা একটু হবে।
বর্ষা- কেন?
আমি-বা পড়ার ক্ষতি হবেনা।
বর্ষা- তুমি না আরো বেশি ক্ষতি হবে।
আরি- বর্ষা!
বর্ষা- বল।
আমি- তুমি খুব ভালোবাস না আমায়?
বর্ষা- সে আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আমি জানি তুমিও আমায় ভালোবাস খুব।
আমি - কিন্তু পনের দিন যে আমায় দেখতে পাবে না।
বর্ষা- কেন?
আমি- আজ তোমায় একটা আনান্দের খবর দেব।
বর্ষা- বল না গো
আমি – বর্ষা, আমি বাংলার হয়ে খেলতে যাচ্ছি গোয়া।
বর্ষা আমার হাতটি তাহার বুকের মাঝে টানিয়া লইয়া বলিল- তাহলে, দশ পনের দিন কেন এক মাস হলেও আমি রাগ করব না। আমি তোমার সাফল্য চাই।
আমি- এসো না একটু বসি।
বর্ষা-চলো।
কুস্তী ধারে একটা বড় গাছ তলায় দুজনে বসিলাম। এই জায়গাটা ও নির্জন। বর্ষা আমার গায়ে ঠেস দিয়া বসিয়া পড়িল। আমি তাহার মাথায় হাত বুলাইতে বুলাইতে বলিলাম- আমি আর একা থাকতে পারছি না বর্ষা।
বর্ষা- কি করতে চাও।
আমি- ঘর বাধতে চাই।
বর্ষা- তোমার বাড়ির লোক মেনে নেবে?
আমি- আমি তো একা থাকি।
বর্ষা- সে জানি। তবু বৌদি আছে না?
আমি- আমার বৌদি সব আমার কাছে।
বর্ষা- একদিন দেখাও না বৌদি কে?
আমি- বৌদি ও তোমায় দেখতে চাইছে। যাবে একদিন?
বর্ষা- যাব। কিন্তু আমার লজ্জা লাগে।
আমি- এসো না আকদিন দেখবে সে আমার কতখানি আদর করে।
বর্ষা- তাই, খুব আদর করে?
আমি - আমার মায়ের সমান।
বর্ষা- শুনেছি। কিন্তু তুমি কবে যাচ্ছ?
আমি- কোথায়?
বর্ষা- কি ভোলা মন গো তোমার! গোয়া যাবে বললে না।
আমি - আগামী পরশু।
বর্ষা - পরশু !!
আমি- হ্যাঁ।
সে কিছুই বলিল না। শুধু আমার দিকে চাহিয়া রহিল।
আমি বলিলাম- কি গো, কি দেখছে।
বর্ষা-অনেক দিন দেখা হবে না তাই।
আমি- দেখ, আমিও দেখি তোমায়।
তাহার পর দুজন দুজনার দিকে চাহিয়া রহিলাম।
সেদিন রাতে সোনা আসিল আমার ঘরে। সে তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী।
সোনা আসিয়াই বলিল- ছোট কাকা?
আমি-কি রে?
সোনা- কাল বাড়ী থাকবে?
আমি - কেন?
সোনা- কাল আমায় স্কুলে দিয়ে আসতে হবে?
আমি- কেন, বড়দা থাকবে না বুঝি!
সোনা- না। বাবা আজই কলকাতায় গেছে।
আমি- কেন?
সোনা- তা আমি জানি না।
আমি-বেশ, দিয়ে আসব। আর শোন বৌদিকে বলবি আমি একবার ডেবেছি। তোর মা যখন একা থাকবে তখন বলবি।
সোনা - তাহলে আমি এখন বলে আসি। এখন মা ভাই কে খাওয়াচ্ছে।
আমি- যা।
সোনা চলিয়া গেল এবং মুহুর্তের মধ্যে ফিরিয়া আসিল।
আমি বলিলাম- বলেছিস?
সোনা- হ্যাঁ।
আমি- মেঝ কাকিমা, ছোট কাকিমা কোথায়?
সোনা- ওরা তো উপরে।
আমি- পরশু আমি গোয়া যাচ্ছি বুঝলি?
সোনা - কোথায়?
আমি- গোয়া।
সোনা - ছোট কাকা কি করবে ওখানে?
আমি- খেলতে যাব।
সোনা- আমার জন্য কি নিয়ে আসবে?
পারি- কি চাস বল?
সোনা- তুমি যা দেবে।
আমি- আচ্ছা দেখি কি পাই।
সোনা - কত দিন থাকবে?
আমি - পনের দিন।
সোমা - অত দিন!
আমি- খেলতে হবে তো।
সোনা আমার গায়ে কাছে আসিয়া বলিল- রেডিওতে তোমার নাম বলবে?
আমি - বলবে।
এই এক মেয়ে রোজ দুইবার করিয়া যে আমার-কাছে না আসিলে ওর পেটের খাদ্য হজম হইবে না, মা বা বাবা একটু বকিলেই আমার কাছে আসিয়া নালিস জানায়। সেদিন আমার কাছেই সে থাকে। তাহার পর বরদা ডাকিয়া লইয়া যায়। বড়দার প্রাণ এই সোনা।
