অপর্ণার বিয়ে, সরকার বাড়ীর বৌ, ১৭ তম পর্ব

  ১৭ তম পর্ব

অতনু সরকার


 




আমি আপনাদের সেই সায়ন। এই বছর আমার খেলার পরিসংখ্যান খুবই ভালো। বেশ খোশ মেজাজে কলকাতা হইতে অনুশীলন করিয়া বাড়ি ফিরিতেছি। হঠাৎ মনে পড়িল কায়েকটি গল্পের  বই কিনিতে হইবে। চলিয়া গেলাম কলেজ স্ট্রী্টে।  সেখানে গিয়া কয়েকটি দোকান ঘুরিয়া বেশ কয়েকটি গল্পের বই সংগ্রহ করিলার্ট একটি দোকানে বই দেখিতেছি এমন সময় আমার  পাশে আসিয়া একটি তরুণী বলিল- এই যে শুনছেন।


আমি বিস্মিত হইয়া বলিলাম -বলুন।


তরুনী বলিল- আপনার নাম কি সায়ন সরকার?


আমি- আছে হ্যা কিন্তু..


তরুনী চট করিয়া বলিল- আমি অপর্ণা রায়।


আমি - অপর্ণা!!


অপর্ণা - মনে পড়ছে না বুঝি?


আমি - আমার সবই মনে থকে অপর্ণা দেবী তবে প্রথমে আপনাকে ঠিক চিনতে পারিনি। 


অপর্ণা- বই পড়েন নাকি? 


আমি বলিলাম -  অনেক।  


অপর্ণা বলিল- চলুন না চা খাই।

 আমি  -  চলুন। 


অপর্ণা  - কোথায় বসা যায় বলুন তো?


আমি - এদিকটা ঠিক ভালো চিনি না, আপনি বলুন।


অপর্ণা- বেশ, আসুন কফি হাউসে বসি।


দুজনে কফি হাউসের একটি টেবিলে গিয়া বসিলাম।


 আমি বলিলাম – তার পর কেমন আছেন?


অপর্ণা -  ভালো।


আমি - শুধু ভালো।


অপর্ণা - আর কি বলব বলুন। আজকের কাগজে  আপনার নাম দেখলাম মশাই।


আমি - তাই নাকি। কি বুঝলেন?


অপর্ণা- যা বোঝার বুঝেছি! কিন্তু আপনি আর আমাদের বাড়িতে যাননি কেন?


আমি- আসলে, আমি যখন যাই তখন আপনি থাকেন না। 


অপর্ণা- ও আপনি যান? ঠিকই বলেছেন আমিই তো থাকি না।


আমি- এখন কোথায় আছেন?


অপর্ণা - বি. এ দিলাম। এবার থেকে কিছুদিন বাড়িতেই আছি। কিছু বই কিনতেই এসেছি।


আমি - গল্পের বই আমি ও কয়েকটি কিনলাম।


অপর্না- সেদিন আপনি খুব দুঃখ পেয়েছিলেন না?


আমি - কোন দিন?


অপর্ণা - বুঝতে পারছেন না। যখন আমাদের বাড়ীতে ছিলেন।


আমি- অর্পনা দেবী আমি অতীত কে ভুল যেতে চাই। ওসব আমার মনে নেই। 


অপর্ণা- কিন্তু সত্যি করে বলুন তো সব অতীত ভোলা যায়, সায়ন বাবু?


আমি- না, তা হয়তো সম্ভব ও নয়।


অপর্না- আমাকে কি আপনার মনেই পড়ে না?


আমি তাহাকে মনে পড়িবার বা  মনে রাখিবার কোন কারণ খুঁজিয়া পাইলাম না। তবে এই মাত্র মনে পারিল তাহাদের ফুল বাগানে তাহাকে প্রথম যেদিন দেখিয়া ছিলাম খুব মিষ্টি লেগেছিল। 


বলিলাম- সত্যি বলতে আমার মনে ছিল না।


অপর্না অভিমান করিয়া কিছু বলিল না। আমিও কিছু বলিবার প্রয়োজন বোধ করিলাম না।


অনেক ক্ষণ পর অপর্না বলিল- চলুন বাড়ী ফেরা যাক।


আমি- চলুন।


দুই দিন পর একটি চিঠি-পাইলাম। দুপুরে আহার সমাপ্ত করিয়া সবে উঠিয়াছি। ঠিক সেই মুহুর্তে পিয়ন আসিয়া চিঠিটি দিয়া গেল।


চিঠি খুলিয়া দেখিলাম-


সায়ন বাবু,


পত্রের প্রথমে আমার উত্তপ্ত হৃদয়ের উষ্ণ ভালবাসা রহিল। পত্র পাইয়াই বুঝিবেন না যে কেন আমি লিখিতেছি। তবে বেশি কিছু লিখিবার সাহস হইতেছে না। তবুও লিখিলাম। আমাদের বাড়ীতে থাকা কালে তাপনি হয়তো আমার কাছ থেকে দুঃখ পাইয়াছেন। হয়তো অপমানিত হইয়া থাকিবেন। সেদিন বুঝিনি।  একটা কথা বলিলে হয়তো আপনি বিশ্বাস করিবেন না, তবুও বলিতেছি, আমি আপনাক ভালোবাসিয়া ফেলিয়াছি। আমি আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থী। যদি আপনার কোন রকম আপত্তি না থাকে তাহা হইলে আগামি সোমবার কফি হাউসের সম্মুখ্রে সকাল এগারটার সময় অপেক্ষা করিবেন


অপর্ণা রায়।


পত্র খানি পড়িয়া নিজেই একটু হাসিলাম। তাহার পর ভাবিলাম বর্ষা গরীব ঘরের মেয়ে হইতে পারে কিন্তু অপর্নার থেকে শত গুনে আগাইয়া আছে। বর্ষা আমার প্রেমিকা, অনুপ্রেরণাদাত্রী, উৎসাহদান কারীনি। আর অর্পনা কোথায় সে। তাহার রূপ থাকিতে পারে তবে সে রূপ আমার মন কে আন্দলিত করে না। তবুও তাহাকে একটি পত্র লিখিলাম -



অপর্ণা,


আপনি ও আমার পত্র প্রেরিত ভালোবাসা লইবেন। আপনার পত্র খানি পড়িলাম। বুঝিবার চেষ্টা করিলাম। কিন্তু  প্রথমেই বলিয়া রাখি আমার একজন প্রেমিকা রহিয়াছে। সেই আমার হৃদয়ের উষ্ণতা। তাই নতুন করিয়া ভিন্ন নারীর সহিত সম্পর্ক-করিতে আমার মন চাহিতেছে না। তাই আপনার প্রস্তাবে সাড়া দিতে পারিলাম না বলিয়া আমি দুঃখিত। সুতরাং কফি হাউসের সম্মুখে দাঁড়াইবার প্রশ্নই ওঠে না। আশা করি আমার অবস্থা অনুধাবন করিবেন।


                                             ইতি 

                                             স.স.


প্রত্র খানি লিখিয়া একবার পড়িয়া খামে ভরিলাম।


ঘড়িতে দেখিলাম এখনো বিস্তর সময় রহিয়াছে। তাই তাড়াতারি করিয়া পত্র খানি ডাকে  ফেলিতে ছুটিলাম। 


ভাবিয়া ছিলাম এ পত্র পাইয়া অর্পনা আর কোন দিন আমার সম্মুখে আসিবে না। পত্র খানি ডাকে ফেলিয়া ফিরিয়া আসিয়া বর্ষার কথা ভাবিতে ছিলাম।


কয়েক দিন পরের কথা। দুপুরে আহারান্তে আমি বিশ্রাম করিতেছি এমন সময় আমার দরজার কড়া নড়িয়া উঠিল। এই অসময়ে কে আসিতে পারে, কোন বন্ধু চিশ্চই হবে, ভাবিতে ভাবিতে দরজা খুলিয়া আমি অবাক হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলাম। অপর্না, আবার আমার আছে আসিয়াছে কেন? কিছুক্ষনের মধ্যেই নিজেকে প্রস্তুত করিয়া বলিলাম- আপনি এই অসময়ে? আসুন।


অপর্ণা আমার সহিত ঘরে প্রবেশ করিল। 

তাহার পর বলিল- অবাক হলেন?


আমি- অবশ্যই অবাক করলেন বটে।


অপর্না - আপনার চিঠি পেলাম। পরে ভাবলাম আপনার রাগ কমেনি। ভেবেছিলাম আপনার কাছে ক্ষমা চাইব। কিন্তু....



আমি - কিন্তু থাক্ । আপনি আমার বাড়ী চিনলেন কি করে?


অপর্ণা-ঠিকানা ছিল মায়ের কাছে। তার সাহায্যে।


আমি - আপনার সাহস আছে বটে।


অপর্ণা- আপনার জনপ্রিয়তাই আমাকে আপনার বাড়িতে পৌছে দিল।


আমি- যাক। কেমন আছেন বলুন?


অপর্না - কেমন দেখছেন?


আমি- মনে তো কিছুই অনুভব করতে পারছি না। তবে আপনার চোখে একটা চঞ্চলতা আছে।


অপর্না হাসিয়া বলিল- থাকাতে পারে। আপনার কাছে যে জন্য আসা.....


আমি – বলুন।


অপর্ণা- দেখুন আমি আপনার সঙ্গে অনেক খারাপ  ব্যবহার করেছি, তাই এখন আপনার কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছি। আমায় ক্ষমা করে দেবেন।


আমি হাসিয়া বলিলাম- একটা বালিকা সুলভ ব্যবহারে জন্য আমি কখনই অপমানিত হইনি। তাই ক্ষমার প্রশ্নই আসে না। 


অপর্ণা - আপনি কি আমাকে বালিকা বলে মনে করেন।


আমি- না, কিন্তু আপনার কথা গুলি কি বালিকা সুলভ নয়?


অপর্ণা একটু ভাবিয়া বলিল - তবে কি আপনার কথা গুলো সেদিন বালক সুলভ ছিল?


আমি- বালিকার সঙ্গে অবশ্যই বালক সুলভ  আচরণ বাঞ্ছনীয়।


অপর্না একটু হাসিল কিছু বলিল না। 


আমিও একটু হাসিয়া বলিলাম- আসা করি আর ক্ষমার কথা উঠবে না। 


অপর্না - আপনার সঙ্গে দেখছি কথাতেও পারা যাবেনা। 


আমি - তাই?


অপর্না -  উপায় কি। তবে আর একটি কথা বলার ছিল। কিন্তু এখন বলা আর ঠিক হবে না।


আমি- কি কথা?


অপর্না - মানুষ ভাবে একক, হয় আর এক। সে যা চায় তা পায় না। এই ধরুন আমি মনে মনে আপনাকে আশা করে ছিলাম। কিন্তু আপনি কল্পনা করে আছেন অন্য এক জন কে?


আমি আর একবার  হো হো করিয়া হাসিয়া


বলিলাম - ও কথায় কাজ কি অপর্না?


অপর্না - কাজ ছিল এখন আর নেই। তবে আমি আপনা কে ভালোবাসি।


আমি - ভালো সবাই কে সবাই বাসতে পারে তাতে আপত্তির কি আছে?


অপর্না - আপত্তির কিছু নেই?


আমি - না। ভারত ব্যক্তি স্বাধীনতার দেশ।


অপর্ণা - কিন্তু আমি যে আপনা ভালোবাসি তার কি হবে?


আমি- ভালোবাসা এক তরফা হয়না অপর্না। আমিও একজন কে ভালোবাসি এবং সেও আমারো ভালোবাসে। 


অপর্ণা - আপনার চিঠিতে তা জেনেছি। 


কথাটা বলিয়া অপর্ণা তাহার ব্যাগ হইতে একটি সুন্দর খাম বাহির করিয়া আমার হাতে দিয়া বলিল- আমার বিয়ের কার্ড। 


আমিও অবাক হইয়া বলিলাম- আপ-না-র বি-য়ে?


অপর্ণা- বিয়ের কার্ড দিতেই এলাম।


এইবার আমি বলিলাম - আপনার বিয়ে ঠিক হওয়ার পরও কেন আমাকে ভালোবাসার কথা জানালেন? পরীক্ষা করছিলেন নাকি? 


আপনা- আপনা কে ভালোবাসি বলে।


আমি - আপনার লাভ? আপনার যে বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। 


অপর্ণা- আপনি যদি আমার প্রস্তাবে রাজি হতেন তাহলে আমি পালিয়ে আসতাম আপনার কাছে। 


আমি- আপনার সাহস আছে মানি। কিন্তু আপনার বাবা মায়ের কি তাতে সম্মান হানি হত না।


অপর্না - হয়তো। যাক এখন আর ও কথায় কাজ কি। কার্ড রইল। আপনি অবশ্যই আসবেন কিন্তু। 


আমি- চেষ্টা করব।


অপর্না - চেষ্টা করবেন মানে। আপনাকে যেতে হবেঃ না হলে বাবা-মা কে আমি কি বলব।


আমি -  বেশ যাব।


অপর্না - তাহলে উঠি।


বলিয়া সে উঠিয়া দাঁড়াইল।


 আমি তখন বলিলাম - আমার বাড়িতে এলেন কিন্তু দেখুন কিছু করতে পারলাম  না। অন্তত এক কাপ চা ও না। চলুন রাস্তায় না হয় দুজনে একটু চা খাওয়া যাবে।


অপর্ণা- চলুন।


রাস্তার মোড়ে মোহনদার চায়ের দোকানে  বসিলাম। তাহার পর চা খাইয়া  অপর্ণা চলিয়া গেল। আমিও এইবার নিশ্চিত মনে বাড়ি ফিরিলাম।


Post a Comment

You are Welcome to the Kotha Koli

Previous Post Next Post