১৯ তম পর্ব
তিন চারদিন টানা বৃষ্টিতে ভিজিয়া আমি শয্যা গ্রহণ করিলাম। সর্দি জ্বর আমাকে কাবু করিয়া ফেলিল। আজ ও বৃষ্টি পড়িতেছে। তারক আর সঞ্জয় কে লইয়া আমি একবার ডাক্তার কে দেখাইয়া আসিলাম। এখন রাত। অপরাহ্ণে সৌম্য মারফৎ আমার অসুস্থতার খবর পৌছাইল বর্ষার কাছে। অনেক চেষ্টা করিয়াও বর্ষা আসিতে পারে নাই। কয়েক দিন দুজন দুজনকে না দেখিয়া দুজনেই হাফাইয়া উঠিয়াছি। আমার সব বন্ধুরাই জানে আমার সহিত বর্ষার প্রেমের কথা। আমি অসুস্থ হইয়া পড়িয়া রহিলাম। বন্ধুরা আসে যায়। মাঝে মাঝে বাহির হইতে খাবার আনাই। কিন্তু বাহিরের আহার গ্রহন করিয়া যে আমার রোগ সারিবে না তাহা একমাত্র আমার বৌদি জানিতে পারিয়া ছিল। কিন্তু সে নিরুপায়। তবু লুকাইয়া খাবার দিয়া যায়। দু দিন পর বৌদি আর উপায় না পাইয়া একদিন সকালেই আমার ঘরে আসিয়া প্রবেশ করিল। আমার পাশে অমর বসিয়া ছিল।
বৌদি তাহাকে বলিল- ভাই অমর একটু বাজার এনে দেবে?
অমর তৎক্ষণাৎ বাহির হইয়া গেল।
বৌদি কাছে আসিয়া বলিল- ওষুধ গুলো খাচ্ছিস ঠিক মতো?
আমি- হ্যাঁ।
বৌদি - আজ থেকে আমি রান্না করে দিয়ে যাব।
আমি- কিন্তু ...
বৌদি - অনেক সয়েছি, আর নয়।
আমি - বৌদি!
বৌদি- অনেক দিন থেকেই অনেক কিছু মুখ বুজে সহ্য করেছি। আর নয়। আজ বিকেলে হয়তো শ্রেয়া আসবে।
আমি- দিদি আসবে?
বৌদি- হ্যাঁ। ওকে খবর দিয়েছি। আর তাছাড়া অনেকক দিন আসে না বেচারা।
আমি-ভালোই হবে।
অমর বাজার লইয়া হাজির। বাজারটা নামাইয়া বলিল - সানু বাইরে একজন অপেক্ষা করছে ডাকব?
বৌদি বলিল- কে?
অমর এক বার বৌদি আর একবার আবার দিকে চাহিয়া বলিল- বর্ষা,
আমি- বর্ষা!
বৌদি- সেকি কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছে।
অমর - আমার সঙ্গে এলো।
বৌদি - ডাক ।
আমি- ডাক্।
অমর ডাকিতেই বর্ষা এক রাশ লজ্জা লইয়া ঘরে প্রবেশ করিল।
আমি বৌদিকে দেখায়াই বর্ষাকেস বলিলাম - বর্ষা আমার বৌদি।
বর্ষা সঙ্গে সঙ্গে একটা প্রনাম করিল।
বৌদি তাহাকে আলিঙ্গন করিয়া বলিল- তুমি ওর পাশে বস ভাই আমি রান্নার ব্যবস্থা করি। ক'দিনে কেমন রোগা হয়ে গেছে না?
বর্ষা- গেছেই তো।
আমি- বৌদি!
বৌদি - বুঝেছি এর নাম বর্ষা, এর সঙ্গে তোর...।
বর্ষা লজ্জা পাইয়া মাথা নত করিল। আমি ও লজ্জা পাইলাম বৌদি আবার বর্ষার দিকে আগাইয়া গিয়া বলিল - লজ্জার কি আছে ভাই। বস আমি আসছি। যেও না কিন্তু , কথা আছে।
বর্ষা- না যাব না। আপনি আসুন আগে।
বৌদি- এই বোকা মেয়ে আপনি নয় তুমি।
বর্ষা হাসিয়া বলিল- তুমি এসো তাহলে। তাড়াতাড়ি এসো কিন্তু।
বৌদি হাসিয়া চলিয়া গেল। অমর আমাদের দুজনের মধ্যে থাকিতে চাহিল না। সেও চলিয়া গেল।
সকলে চলিয়া গেলে বর্ষা আমার পাশে আসিয়া বসিল। তাহার পর বলিল- কি করে হলো?
আমি- পর পর ক'দিন ভিজে খেলেছি, তাতেই একটু জ্বর এসে গেল।
বর্ষা রাগিয়া বলিল- তবে ভিজতে যাও কেন?
আমি- বাঃ মাঠের খেলা কি ঘরে হবে।
বর্ষা- তুমি মাঝে মাঝে এমন চিন্তায় কেন ফেল?
আমি – কেন? কিসের চিন্তা?
বর্ষা- চিন্তা নয়। এই দেখ কি রোগ বাধিয়ে বসলে। কবে সারবে ঠিক নেই।
আমি- তুমি এসেছ এবার সারবে।
বর্ষা- আমি না এলে কি সারতো না?
আমি - হুঁ। তবে দেরি করে। তুমি আমার....
আমি বৌদিকে দেখিয়া থামিলাম। বৌদি বোধ হয় আমার শেষ কথাটা শুনিয়াছে। তাই বলিল- এই যা, এমন সময়ে এসে পড়লাম।
কে বলিবে এই রসিকতা কারীনি আমার স্নেহময়ী বৌদি।
আমি বৌদির কথা শুনিয়া বলিলাম - না না। তুমি ঠিক সময়েই এসেছ।
বৌদি বর্ষার পাশে আসিয়া বসিল। তাহার পর বর্ষার হাতটি নিজের হাতে টানিয়া বলিল - ভাই বর্ষা, তোমার নাম টি যেমন সুন্দর তুমিও তেমন সুন্দরী। কিন্তু বলি কি আমার এই ছোট ঠাকুরপো টিকে তুমি ভালবাস তো!
বর্ষা মাথা নত করিয়া বলিল- খুব। ও ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না।
বৌদি বর্ষাকে তাহার বুকের মাঝে টানিয়া লইয়া বলিল - হ্যাঁ ভাই তুমি পারবে।
বর্ষা - তুমি আশির্বাদ কর দিদি।
বৌদি - নিশ্চই করবো বোন। একবার যখন দিদি বলে ডেকেছ তখন আর ভয় কি।
আমাদের কথার মাঝে তনু কাঁদিয়া উঠিল। বৌদি আড়াতাড়ি চলিয়া গেল। একটু পরে তনুকে কোলে করিয়া বৌদি ফিরিয়া আসিল। তাহার পর অনেক কথা হইল। বৌদি চলিয়া গেল। বর্ষা আমার মাথায় হাত বুলাইতে ছিল। তাহার ফিরিবার সময় হইয়া গিয়াছে দেখিয়া বর্ষা আমার উত্তপ্ত ললাটের উপর দীর্ঘ চুম্বন করিয়া চলিয়া গেল।
দুদিন পর আমি সারিয়া উঠিলাম। সেদিন পূর্ণিমার রাত। বর্ষা এখন দিনের বেলা বাড়ী হইতে বাহির হইতে পরিতেছে না। তাহার মাতা ভীষন অসুস্থ। তাই সারাদিন তাহাকে বাড়ির কাজ করিতে হয়। সৌম্য আসিয়া খবর দিল আজ রাতে বর্ষা আমাকে কুন্তির তীরে দেখা করিতে বলিয়াছে।
সেই মতো আমি কুন্তি নদীর তীরে আসিয়া নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়াইলাম। পূর্ণিমার পূর্ণ চন্দ্রালোকে চারিদিকে আলোয় ভরা। চন্দ্রের প্রতিচ্ছবি কুন্তীর জলে পড়িয়া চিক চিক করিতেছে। জল গজেন্দ্র গামীনি গতিতে প্রবাহিত হইতেছে। সেই জলের মৃদু শব্দ আর ঝিঁঝি পোকার শব্দ শুনিতে ছিলাম। আর একটি শব্দ শুনিবার জন্য আমার মন অধির আগ্রহে অপেক্ষণ করিতেছিল, তাহা হইল বর্ষার পায়ের নূপুরের শব্দ।
না বেশিক্ষন আমাকে অপেক্ষা করিতে হইল না। অতি-ধীরে একটি ছায়া মুর্তি নূপুরের সুর তুলিয়া আসিতেছে। তাহার আগমনেই বুঝিলাম বর্ষা। বর্ষা কিছু দুর আসিয়া দাঁড়াইল। আমি তাহার নাম ধরিয়া বলিলাম- বর্ষা!
মূর্তি কোন শব্দ না করিয়া পূর্বের মতো ধীরে আসিতে লাগিল। তাহার পর যখন সেই মূর্তিমান ছায়া আমার সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল বুঝিলাম এই বর্ষা। বর্ষা আমার আরো কাছে আসিয়া বলিল-চলো বসি। অনেক কথা আছে। তাহার কথা মতো আমরা নদীর তীরে সবুজ ঘাসের উপর বসিলাম। আজকের এই মধুর রাত-বোধ হয় এই রকমই একটি অভিসার কল্পনা করিয়া রচিত হইয়া ছিল। পূর্ণিমার আলোয় দুজনেই কাছাকাছি হইয়া বসিলাম। দু-একটি ডিঙি নৌকা তখন ও নদীর বুকে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। আজ এই রাতে বর্ষাকে আরো ভালোলাগিতে ছিল।
সে বলিল - আমি ভেবে ছিলাম তুমি আসবে না।
আমি - তোমার ডাক কি উপেক্ষণ করতে পারি?
বর্ষা- কেন ডেকেছি জান?
আমি- না বললে জানব কি করে।
বর্ষা- কিছু দিন যাবৎ মায়ের শরীর খুব খারাপ, তাই দিনের বেলা সময় হয় না। তার মধ্যে মা চাইছে এ বছরই আমার বিয়ে দেবে। ছেলেও মায়ের পছন্দ।
আমি- আমাকে তো তোমার বাড়ীতে যেতে দিচ্ছ না।
বর্ষা- তুমি যাবে? তুমি আমাদের বাড়ি গিয়ে বিয়ের প্রস্তাব করলে বাবা -মা যদি রাজি না হয় তখন তোমার মান থাকবে?
আমি- এমানে মান সম্মানের প্রশ্নই নেই।
বর্ষা - তুমি জান না আমাদের বাড়ীতে তোমার কত আদর।
আমি- তাহলে আপত্তি কোথায়?
বর্ষা - তাই বলে তুমি যাবে।
আমি- বেশ তাহলে তুমি বল।
বর্ষা- আমি!
আমি- হ্যাঁ। বলে দেখ না।
বর্ষা -আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারব না গো।
আমি- আচ্ছা যারা তোমায় পছন্দ করে গেছে তারা কোথায় থাকে জান?
বর্ষা - বলাগড়।
আমি- ছেলে কি করে?
বর্ষা- চাষ আবাদ। আমাদের মতোই ঘর।
আমি- শোন কিছু তো একটা করতে হবে।
বর্ষা তাহার শরীরটি আমার কোলের উপর রাখিয়া বলিল- তুমি যা হোক একাটা ব্যবস্থা কর।
আমি তাহার মাথায় হাত বুলাইয়া বলিলাম -বর্ষা তুমি আর দু- মাস অপেক্ষণ করতে পারবে না? বুঝতেই তো পার খেলাই আমার পেশা। আর এই দুই মাস খেলার মধ্যেই আমি ব্যস্ত থাকব। এখন আমার খেলা চলবে। আমাকে সারা ভারত ঘুরে বেড়াতে হবে। তিমি তো জান সব।
বর্ষা - পারব।
আমি- বেশ, এই আমি কথা দিলাম তুমি আমার, শুধু আমার।
বর্ষা কিছু বলিল না শুধু আমাকে জোরে চাপিয়া ধরিল। আমি তাহাকে বুকের মাঝে টানিয়া ধরিলাম। বহু ক্ষণ এই ভাবে থাকার পর সে বলিল- চলো উঠি।
আমি -চলো।
দুজনে আবার সেই রাতের আধা অন্ধকার পথ ধরিয়া চলিতে লাগিলাম।
রাতে বাড়ি আসিয়া আর ঘুম আসিল না। একটি চেয়ার লাইয়া খোলা জানালার ধারে আসিয়া বসিলাম। আজ আমার বহু পূর্বের কথা মনে পড়িল। স্মৃতির পাতা উল্টাইতে উল্টাইতে একে বারে শৈশবে আসিয়া পড়িলাম। মনে পড়ে সেই কোন শৈশবে বাবা কে হারাইয়াছি। মা কে যতটা মনে পড়ে বাবাকে কিছুই মনে পড়েনা। মা কে হারাইয়া পাইলাম এক তরুণী বৌদির অপরিসীম মায়া মমতা। আর সেই বৌদির কোলে পিঠে চড়িয়া তাহার আপার স্নেহে বড় হইয়াছি। সুখে-দুঃখে, মানে- অভিমানে, রাগে তাহার কাছে গিয়া আমি আশ্রায় পাইয়াছি। আমি অনেক হতাশায়, অনেক বেদনায়, আহত হইয়া যখনই বৌদির কাছে গিয়াছি তখনই এক মহা শান্তি পাইয়াছি। আবার যখন এক রাশ একাকিত্ব লইয়া আমি নিজের মধ্যে নিজেই হারাইয়া যাইতে বসিয়া ছিলাম সেই মমতাময়ী আসিয়া আমায় রক্ষা করিয়াছে।
তাহার পর বর্ষা। বর্ষা আমার কাছে উজ্জ্বল তারা। মনে পড়িল তাহার সহিত আমার প্রথম দেখা, প্রথম সাম্মাৎ এবং প্রথম প্রেম। তাহার পর সে আমাকে কত প্রেরনা দিয়াছে, প্রেম দিয়াছে এবং উৎসাহ দিয়াছে। আমার জীবনে এই দুই নারী আমাকে অনেক কিছু দিয়াছে।
তারপর আজ রাতের অভিসার আমাকে আরো ভাবাইয়া তুলিয়াছে। ভাবছি সরাসরি ওদের বাড়ী চলে যাব।
.png)