২১ তম পর্ব ( শেষ পর্ব)
বর্ষার মা তাহার বিবাহের জন্য অত্যন্ত বিচলিত হইয়া পড়িয়াছে। তাহাকে কি এক কঠিন রোগে ধরিয়াছে। তাই মেয়ের বিবাহ দেখিয়া যাইবার সখ হইয়াছে। বড় ছেলের বিবাহ হইয়াছে ।তবু মেয়ের বিবাহ বলিয়া কথা। বর্ষার জন্য পাত্র ঠিক হইয়া গিয়াছে। আগামী ফাল্গুন মাসে তাহার বিবাহ। বিবাহের দিন স্থির হইতেই বর্ষার মন-প্রান চঞ্চল হইয়া উঠিল। বাড়ির কিছুতেই তাহার মন বসিতেছে না। আহারে তাহার রুচি নাই। যৌবনের সন্ধিক্ষণে মনের প্রগাঢ় মানস পটে হৃদয়ের সমস্ত ভালোবাসা প্রথম যাহাকে নিবেদন করিয়াছে সেই সায়নের জন্য বর্ষা আজ অপেক্ষামান। সায়ন তাহার এমন প্রেম। সায়ন তাহার জীবনের প্রথম পুরষ। তাই বর্ষা অহরহ তাহার কল্পনা করে। আর মাঝে মাঝে ভাবে সে কি পারিবে সায়ন সরকারের বৌ হইতে, সে কি পারিবে সরকার বাড়ীর অন্দর মহলে ঢুকিতে। তবে বড় বৌদিকে তাহার খুব ভালো লাগে। এক বারের পরিচয়ে বড় বৌদি তাহার মন হরণ করিয়া লইয়াছে।
ইন্দ্রজিৎ একদিন বর্ষার বাড়িতে আসিয়া উপস্থিত হইল। কিন্তু অনেক চেষ্টা করিয়াও বর্ষার বাবা-মায়ের সম্মতি আদায় করিতে পারিল না। বর্ষা তাহার বাবা-মায়ের কথায় ঘরে দরজা দিয়া ক্রন্দন করিতে লাগিল। বর্ষার মা-বাবার এক কথা তাহারা বলাগড়ে ছেলের বাড়িতে কথা দিয়াছে সে কথা আর প্রত্যাহার করিবার নহে। ভগ্ন মনে ইন্দ্রজিৎ বাড়ী ফিরিল। প্রথমে বর্ষার বাবা- মা ও কল্পনা করিতে পারে নাই যে এত বড় বাড়ীর বৌ করিবারর জন্য প্রস্তাব করিতে পারে।
বর্ষার বাবা-মা জানিতে পারিল যে তাহার সহিত সায়নের একটা প্রেমের সম্পর্ক রহিয়াছে। এখন বর্ষার বাড়ির বাহিরে যাওয়া নিসিদ্ধ হইয়া গেল। কিন্তু এক জন এই সম্পর্ক শুনিয়া খুবই আনন্দিত হইয়া উঠিল। সে হইল পল্টু। পল্টু বড় খেলয়ার হইবার স্বপ্ন দেখে। সায়ন তাহার আদর্শ। আর সেই সায়নের সহিত তাহার এক মাত্র দিদির সম্পর্ক শুনিয়া খুবই খুসি হইল। কিন্তু বর্ষার হৃদয় বুঝি ভাঙিয়া পড়িল। তাহার প্রথম প্রেম বুঝি হারাইয়া যাইবে।
এদিকে সায়ন সব কথা শুনিল বৌদির কাছে। তাহার হৃদয়ে ঝড় উঠিয়া গেল।
বৌদিকে বলিল- বৌদি ও ছাড়া আমি বাঁচব না।
বৌদি - জানি।
সামন - আমি এখন কি করব বল?
বৌদি - তুই পুরুষ। দরকার হলে তুলে নিয়ে আসবি।
সায়ন - বৌদি।
বৌদি - বর্ষা রাজি তো।
সায়ন- হ্যাঁ।
ভয় কি। ওকে বলবি চলে আসতে। তার পর ঠাকুর বাড়ি গিয়ে..
সা - শুনলাম ওকে বাড়ী থেকে বের হতে দিচ্ছে না।
বৌদি -সে কি?
ঠিক সেই সময় বাড়ির সদর দরজার কড়া নড়িল।
সায়ন গিয়া দরজা খুলিয়া দেখিল, পল্টুকে।
পল্টু সায়ন কে দেখিয়া আনান্দে বলিল- সানু দা দিদি আজ রাতে তোমায় দেখা করতে বলেছে।
সায়ন- কোথায়?
পল্টু- নদীর ধারে।
সায়ন- তোর দিদিকে চুপি চুপি বলবি আমি যাব।
পল্টু- আচ্ছা।
পল্টু দ্রুত চলিয়া গেল। সানুর পিছনে বৌদি আসিয়া দাঁড়াইয়া ছিল তাহা সে জানিত না।
বৌদি বলিল- আজই ঠিক সময়। আজ রাতেই আমি বধূ বরণ করব।
সায়ন - বৌদি!
বৌদি- কোন কথা নয়।
আমি আজ ও অভিসারে চলিলাম। আজ মাসের অষ্ট্মী। এক ফালি চাঁদ নীল আকাশের বুকে উকি মারিতেছে। গায়ে একটি চাদর চাপাইয়া আমার লক্ষ্য পথে আগাইয়া চলিলাম। নির্দিষ্ট স্থানে আসিয়া থামিলাম। আজ দেখিলাম আমার আগেই বর্ষা আসিয়া উপস্থিত। তখন রাত এগারোটা বাজে। বর্ষার গায়ে একটি কালো চাদর। আমাকে দেখিয়া বর্ষা আমার কাছে আসিল।
আমি বলিলাম - কেমন আছ?
বর্ষা আমার আরো কাছে আসিয়া আমাকে জড়াইয়া ধরিল। তাহার পর বলিল - তুমি আমাকে বাঁচাও।
আমি - কেন? কি হয়েছে।
বর্ষা- আগামী পয়লা ফাল্গুন আমার বিয়ে।
কাল আমাকে যেতে হবে মামার বাড়ি।। ওখানে থেকেই বিয়ে হওয়ার কথা।
আমি তাহার হাত ধরিয়া বলিলাম- চলো। আর তোমাকে কোন কষ্ট করতে হবে না।
বর্ষা- আমি দাদা কে বলে এসেছি। দাদা রাজি আছে।
আমি – তাহলে আর কি চল।
বর্ষা খুব শক্ত করিয়া আমার হাত ধরিল।সেই রাতেই বাড়ি ফিরিলাম বর্ষা- কে লইয়া।
আমি আমার হৃদয়ের রানীকে লইয়া যখন বাড়ির সদর দরজার কাছে আসিলাম তখন দেখিলাম বৌদি আমাদের জন্য অপেক্ষণ করিতেছে। পিছনে দাদা।
প্রথমে আমরা দুজনে দাদা-বৌদি কে প্রনাম করিলাম। তাহার পর বৌদি আমাদের লাইয়া ঠাকুর ঘরে গেল। তাহার পর বাড়ির গৃহ দেবতাকে সম্মুখে রাখিয়া আমি বর্ষার সিঁথি সিঁদুরে রাঙিয়ে দিলাম।
বৌদিই দুজনকে উপরের ঘরে পৌছাইয়া দিল।
তাহার পর বর্ষাকে কিছু উপদেশ দিয়া আমাকে কিছু হুকুম দিয়া বৌদি নীচে নামিয়া গেল।
আমি বর্ষাকে বলিলাম- বর্ষা তুমি খুসি তো।
বর্ষা - খুসি।
তাহার দু চোখে জল ছলছল করিতেছে দেখিয়া বলিলাম- বর্ষা আজ এই সুখের দিনে তোমার চোখে জল!!
বর্ষা- এ জল আনন্দের। আর এ আনান্দ তোমাকে পাওয়ার।
আমি বর্ষা কে বুকে টানিয়া লইয়া বলিলাম -তুমি ও আমার প্রথম প্রেম, তোমাকে পেয়ে আজ আমি ভীষণ খুসি।
বর্ষা আজ আর নিজেকে মুক্ত করিবার চেষ্টা করিল, না। আরো নিবিড় হইয়া আমার বুকের মাঝে মিশিয়া যাইতে চাহিল। তাহার পর বলিল- এসো আমরা আ কের রাতটা জেগেই কাটাই।
আমি- চলো ওই জানলার কাছে চলো।
বর্ষা আর আমি জানলার কাছে আসিয়া দাঁড়াইলাম। বর্ষা আমার বাহু বন্ধনে আবদ্ধ হইয়া পরম আনান্দে আমার বুকে মাথা রাখিল। রূপসী রাত আর চন্দ্রের ক্ষীণ আলো আমাদের কাছে আরা রূপসী হইয়া উঠিল। বর্ষার আমার বুকে মাথা রাখিয়া আর নড়িল না। মাঝে মাঝে দু-একটি কথা বলিতেছিলাম দুজনেই। অনেক ক্ষণ পর আমি বর্ষার মাথাটি সযত্নে তুলিয়া তাহার মুখে একটি দীর্ঘ চুম্বন করিয়া বলিলাম- দেখ বর্ষা দেখ কি সুন্দর লাগছে কুম্ভীর জল।
বর্ষা সেই দিকে চাহিয়া বলিল- আঃ কি অপূর্ব।
আবার দুজনে নিস্তব্ধ হইয়া গজেন্দ্রগামীনি কুন্তীর দিকে চাহিয়া রহিলাম।
আর ধীরে ধীরে আজকের এই অপূর্ব সুন্দর রূপসী রাত আরো গভীর হইতে লাগিল....।
সমাপ্ত
রচনা কাল: ২২ শে জ্যেষ্ঠ হইতে ৩০শে আষাঢ়। ১৪১১ বঙ্গাব্দ।
ইংরেজি ৫ই জুন, ২০০৪ থেকে ১৪ই জুলাই, ২০০৪
