২০ তম পর্ব
সরকার বাড়ির উপর সে মেঘ জমিয়া ছিল তাহা বৃষ্টি হইয়া ঝরিয়া পড়িল। অভিজিৎ আর স্বপন এই বাড়ি ছাড়িয়া কলকাতায় নতুন বাড়িতে চলিয়া যাইবে। এই লইয়া বেশ কিছু দিন ধরিয়া একটা চাপা গুঞ্জন রহিয়াছে। অভিজিৎ সরাসরি বড়দা ইন্দ্রজিৎ কে একদিন বাড়ী ভাগা ভাগি করিয়া লইবার কথা বলিল। বাড়ীতে যাহার যে টুকু পাওনা তাহার সেই পরিমান অর্থ ভাগ করিয়া দেবার প্রস্তাব করিল। ইন্দ্র পড়িল মুসকিলে। সে উকিল ডাকিয়া এই সরকার বাড়ির কত মূল্য হইতে পারে তাহার একটা হিসাব এবং বাড়ির আইন গত অধিকার লইয়া আলোচনা করিল। সেই অনুযায়ী সরকার বাড়ির সমস্ত সম্পত্তি চার ভাই ও এক বোনের পাওনা। আলোচনা করিয়া সরকার বাড়ি এবং যে জায়গা জমি রহিয়াছে তাহার মূল দাঁড়াইল আট লক্ষ ঢাকা।
রাতে চার চাই এবং এক বোন একত্রে একটি ঘরে মিলিত হইল। স্বপন নিজে গিয়া তাহাদের এক মাত্র বোন কে লইয়া আসিয়াছে। সময় মতো আলোচনা শুরু হইল।
ইন্দ্র বলিল- এই বাড়ীর বর্তমান মূল্য অট লক্ষ টাকা। সঙ্গে জায়গা জমি ও আছে। এবার তোদের কার কি বলার বল।
অভি- আমাদের প্রাপ্ত অর্থ আমাদের দিয়ে দেওয়া হোক।
শ্রেয়া- কেন? বড়দা অত টাকা দেবে কি করে? তুমি আর সেজদা চলে যেতে চাইছ। যাওনা।
স্বপন ভাবিয়া ছিল শ্রেয়া ও কিছু দাবি করিতে পারে। কিন্তু তাহার মুখ হইতে এই কথা শুনিয়া স্বপন বলিল- বাঃ আমাদের ভাগ ছাড়ব কেন?
শ্রেয়া - ছাড়বে না তাহলে এমানে থাক।
অভি - আমারা থাকব কি না থাকাব তা তুই বলবি।
শ্রেয়া- না। আমি তা বলতে চাই নি মেঝদা।
ইন্দ্র- তোরা কি চাস্।
অভি - সে তো বললাম।
ইন্দ্র- বেশ। তাহলে এই বাড়ী বিক্রি করে দিই। তোরা খদ্দের দেখ।
সানু- আমরা কোথায় থাকব?
ইন্দ্র- বাড়ি বিক্রির টাকা ভাগাভাগি হয়ে যা পাবি তা দিয়ে অন্য জায়গা কিনে ঘর করবি। আমি আর কি করব বল। এতো দিন ধরে তো তোদের মানুষ করলাম। আর এখন আমাকে তোরা ভিটে ছাড়া করছিস।
সানু- তাই বলে বাড়ি বিক্রি হবে কেন।
ইন্দ্র-তা হলে টাকা পাব কোথায়?
সানু- না এ বাড়ী তুমি বিক্রি করতে পারবে না।
শ্রেয়া - আমার ও তাই মত।
স্বপন-বেশ। তাহলে বাড়ি ভাগ হোক।
অভি - বেশ তাই হোক। উপর তলা আমাদের ছেড়ে
দাও। আমরা ভাড়া দেব।
ইন্দ্র - ঠিক আছে।
শ্রেয়া- আমার ভাগ। তোমরা তো যে যার মতো গুছিয়ে নিলে আমরাটা কোথায় যাবে?
সকালেই চুপ করিয়া গেল।
সানু বলিল- তোমরা কত টাকা হলে এ বাড়ির অধিকার ছাড়বে?
স্বপন- মনে হচ্ছে তুই কিনবি?
সানু - আমি উত্তরটা চাই, কে কিনবে সেটা জেনে তোমাদের কি লাভ।
অভিজিৎ একটু ভাবিয়া বলিল- দাদা- ভাইয়ের সঙ্গে দর দরি করব না। আমি আর স্বপন দেড় লক্ষ করে পেলেই হবে।
সানু বলিল- বেশ তাই দেব। বড়দা তুমি উকিল ডাক।
ইন্দ্র -তুই কোথায় পাবি অতো টাকা।
সানু - তোমার চিন্তা নেই আমি কালকেই টাকা দিয়ে দেব। কাল্কেই যেন ওরা ঘর ছেড়ে চলে যায়।
সকলেই জানে সায়ন এখন তাহাদের থেকে ও বেশি টাকা আয় করে। ওরা সরকারি চাকরি করে । তাহারা দু বছরে যাহা করিতে পারে নাই সানু এক বছরে তাহার দ্বিগুন আয় করিয়াছে।
সানু বলিল-নতুন উইলে বা বড়দার আর আমার নাম থাকবে।
শ্রেয়া হাসিয়া বলিল- আমি?
সানু - তোর ব্যবস্থা হবে দিদি। আগ এদের দাবি মিটাই। যারা সব থাকতেও কাঙাল তাদের টা আগে দিয়েদি।
শুনিয়া অভিজিৎ ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল। স্বপন ও চলিয়া গেল। তাহার পর শ্রেয়া বলিল - আমার কিছু দরকার নেই বড়দা।
ইন্দ্র- কেন?
শ্রেয়া- আমি ওদের মতো কাঙাল নই। আমি ওদের সামনে বলেছি মাত্র। আমি কিছু নিতাম না।
পরদিন নতুন ভাবে সরকার বাড়ির দলিল রচিত হইল। তাহার দু-এক দিন পর অভিজিৎ এবং স্বপন তাহাদের পাওনা পাইয়া, বাড়ী ছাড়িয়া তাহাদের নতুন বাড়ীর উদ্দেশ্যে চলিয়া গেল। শ্রেয়া তখন ও বাড়ী যায় নাই। এখন সমগ্র বাড়ির দখল ইন্দ্র আর সানুর। ইন্দ্র স্বেচ্ছায় সানুকে উপর তলা ছাড়িয়া দিয়াছে। উপরের একটি ঘরে বসিয়া সানু আর শ্রেয়া কথা বলিতে ছিল। পাশের ঘরে সোনা বই পড়িতেছে। ইদানিং ছোটকাকার কাছে না আসিলে তাহার পড়া হয় না।
শ্রেয়া কে সানু বর্ষার বলিতেছিল। বর্ষার কথা শুনিয়া শ্রেয়া বলিল- তাহলে বড়দা কে বল না ওদের বাড়িতে যেতে।
ঠিক সেই সময় তানিয়া ট্রেতে করিয়া গরম লুচি লইয়া হাজির হইল। তানিয়া বোধ হয় শ্রেয়ার শেষ কথাটা শুনিয়াছে। তাই ঘরে ঢুকিয়াই বলিল-সানু বলবে বড়দা কে।
শ্রেয়া- তুমি বল না বৌদি, বড়দা কে?
বৌদি হাসিয়া বলিল - বলব। এখন খাও তো।
সানু - একটু বস বৌদি। সারা দিন তো কাজ আর।
বৌদি - আমাকে কোথায় কাজ করতে দেখলি। কাজ তো করে কাজের লোক।
কথা গুলি বলিয়া বৌদি বসিয়া পড়িল।
তাহার পর বলিল - সানু তুই যে ভাবে আমাদের রক্ষা করলি। তুই না থাকলে কি হত কি জানি।
সানু- তুমি ও তো একদিন আমাদের এই দুই ভাই-বোন কে রক্ষা করেছিলে।
বৌদি - তোর জন্য আজ সরকার বাড়ির সম্মান বাঁচল।
বলিয়া কাপড়ের আঁচল দিয়া চোখ মুছিল।
শ্রেয়া বলিল- বৌদি, যা হয়ে গেছে তা নিয়ে আর কথা বলে লাভ কি বল।
সানু- একটু হাস না বৌদি।
বৌদি তাড়াতাড়ি কাপড়ের আচল ঠিক করিয়া হাসিয়া সানুকে বুকে টানিয়া বলিল- তোরাই তো আমার সব রে।
সানু-জানি বৌদি।
বৌদি- সোনা, তনু আর তুই আমার....
শ্রেয়া বাধা দিয়া বলিল- আমি!
বৌদি- তোর বিয়ে হয়েগেছে। তোকে আর কতক্ষণ কাছে পাই বল।
শ্রেয়া হাসিয়া বলিল – তাই বল। তাহলে বৌদি তুমি বড়দাকে বল সানুর কথা
বৌদি- বলব। আজই বলব।
সানু-কি বলবে?
বৌদি - সে যখন বলব তখন ঠিক করব।
শ্রেয়া- তোর শুনেই বা কি লাভ?
সানু কোন কথা না বলিয়া লুচি খাইতে শুরু করিল।
শ্রেয়া একটা লুচি খাইয়া বলিল- বৌদি তুমি আমাদের দুজনের মায়ে মতো। আজ যদি মা থাকত তাহলে এই ভাবেই আদর আপ্যায়ন করত।
তানিয়া কিছু বলিল না। চাহিয়া রহিল। শুধু তাহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল।
