ষষ্ট পর্ব
অতনু সরকার
সন্ধ্যা হইয়াছে, ঘড়িতে সাতটা বাজে। ইন্দ্র বাড়ি ফিরিয় আসিল। রোজই সে এই সময় বাড়ি ফেরে। নিজের ঘরে বসিয়া তানিয়া মেয়ে কে স্বরবর্ণ শিখাইতে ছিল। ইন্দ্র ঘরে প্রবেশ করিয়া তাহার পাশে বসিল। ইন্দ্র আর তানিয়া একে অপরের পরিপূরক। দুজনের মধ্যে এমন মিল খুব একটা দেখা যায় না। আসলে দুজের স্বভাব প্রায় একই। দুজনেই শান্ত, ধীর-স্থির। ইন্দ্র কাছে আসিয়া বসিতেই তানিয়া বলিল- হ্যাঁ গো সানুর কি হবে, কি ভাবলে?
ইন্দ্র এনাটা দ্বীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল- দেখ ঘটনা তো কিছুই নয়, আমি বুঝি কিন্তু অভি আর স্বপা যে ভাবে রেগে আছে তাতে কি যে করি, দেখা যাক।
তানিয়া বলিল- শুধু ওরা, মেজবৌ ছোটবৌ!
ইন্দ্র- কি করি বলত।
তানিয়া -সেই বাকবে মা আমার হাতে তোমার ছোট দুই ভাই বোন কে দিয়ে বলেছিল বৌমা এদের নিজের মনে করে মানুষ কর। করেছি ও তাই। কোলে পিঠে করে তো অদের বড় করেছি, কোন দিন ভাবিনি যে এমন খারাপ কিছু করতে পারে। আসলে ভালোবেসে ডাকতে দিয়েছিল। আরো একটা কারণ আছে তবে সেটা পরে বলব।
ইন্দ্র- সব জানি, তুমি এমন ওই ভাবে সংসারের হাল না ধরলে কোথায় যেত ওরা। তানিয়া আমি বাইরেরও সানুর সম্বন্ধে খোজ নিয়েছি। ওকে সবাই ভালোবাসে সকলেই নিশ্চই এমনি এমনি ভালোবাসে না।
তানিয়া ইন্দ্রের হাত ধরিয়া বলিল- এর যেন খারাপ কোন ব্যবস্থা না হয়।
ইন্দ্র- এমন অভি বা স্বপা কোডই ছোট নেই বড়বৌ।
তানিয়া - তুমি তো বড়। তোমার কথা নিশ্চই শুনবে।
ইন্দ্র- না শুনলে কিছু বলার থাকবে না।
তানিয়া চোখের জল ফেলিয়া ক্রন্দন করিয়া বলিল- ওকে যদি তাড়িয়ে দাও তাহলে আমি ও আর এ বাড়িতে থাকব না।
বলিয়া মেয়েকে বুকের কাছে টানিয়া লইল।
রাতে তিন ভাই এক সঙ্গে- বসিল। অভিজিৎ এবং স্বপন দুজনের মত যদি সায়ন সংসারে পয়সা দেয় তবেই থাকিতে পারিবে। নচেৎ নয়।
তাহাদের কথা শুনিয়া ইন্দ্র বলিল- তোমরা যমন কেউ চাকরি পাওনি তখন কিন্তু আমিই তোমাদেরক দেখেছি।
দুই ভাই কিছুমান চুপ করিয়া গেল। তারপর অভি বলিল - কিন্তু ওর মধ্যে তো কাজের কোন লক্ষন দেখতে পাই না।
স্বপা বলিল - ও যদি থাকে সাহলে আমরাই বাড়ি ছেড়ে চলে যাব।
ইন্দ্র - তোমরা একটা সামান্য ব্যাপার নিয়ে এমন বড় করে তুলছ কেন?
অভি- তোমার কাছে যেটা সামান্য সেটা আমাদের কাছে সামান্য নয় দাদা।
ইন্দ্র- বেশ তোমরা কি চাও বল।
অভি- ওকে আলাদা করে দাও। তখন বুঝবে বসে খাওয়ার মজা।
স্বপা- আমার ও অই মত।
ঠিক সেই সময় মেজ বৌ রূপা চায়ের পাত্র লইয়া ঘরে ঢুকিল। সেও বোধ করি পূর্ব কথা শুনিয়াছে।
তাই ঘরে ঢুকিয়া চা ঢালিতে ঢালিতে বলিল- ওমন ছেলের মুখ আর আমি দেখতে চাই না।
তানিয়া ও কি একটা করিতে ঘরে ঢুকিয়া মেঝ বৌয়ের কথা শুনিয়া বলিল-কি বলছিস মেঝবৌ।
মেঝ -ঠিকই বলছি দিদি।
বড়বৌ - মেঝ বৌ !!
মেঘবৌ রূপা চুপ করিয়া চা পরিবেশন করিয়া চলিয়া গেল।
স্বপন বলিল- একজনকে নিয়ে যখন ঝামেলা তখন একটা ব্যবস্থা করতে হয়।
তানিয়া অভিকে ঠাকুর পো বলিয়া ভাবিলেও স্বপন
কে স্বপা বলিয়া ডাকে।
তানিয়া বলিল- স্বপা তুমিও শেষে...
স্বপন - বৌদি তুমি কি চাও তোমার হাতের গড়া সংসার ভেঙে যাক।
তানিয়া- মৃত্যুর পর ও আমি চাইব না।
অভি - তবে।
তানিয়া - তবে কি ঠাকুরপো?
অভিজিৎ কিছু বলিল না। স্বপন ও চুপ।
ইন্দ্র বলিল - তোমাদের কথাই থাকল। নীচের যে ঘরে সানু থাকে সেই ঘরটি আর তার পাশের মায়ের ঘরটি ওকে দিয়ে দাও। ও আলাদাই থাকবে। আর মায়ের ঘরের যে বাইরের দরজা আছে ওটাই ও সদর করে নেবে। এদিকের সব কিছু ওর জন্য বন্ধ। তাহলে তো মেঝ বা ছোটবৌকে ওর মুখ দেখতে হবে না।
কথা গুলি বলিয়া ইন্দ্র চলিয়া গেল। তানিয়া দাঁড়াইয়াছিল। ইন্দ্রের কথা শুনিয়া মাথা ঘুরিয়া পড়িয়া গেল। ইন্দ্র সঙ্গে সঙ্গে ছুটিয়া আসিয়া তাহাকে তুলিয়া বিছানায় শুইয়ে দিল।
অভিজিৎ আর স্বপন ধীরে ধীরে ঘর ছাড়িয়া চলিয়া গেল। কিছুম্মান পর মেঝ আর ছোট বৌ ছুটিয়া আসিল। তাহাদের দেখিয়া ইন্দ্র সেখান থেকে সরিয়া নিজের মেয়ের কাছে বসিল।
সায়ন রাতে বাড়ি ফিরিয়া যখন খাইতে বসিল তখন তানিয়া বলিল- নে এই আজ তোর এবাড়িতে শেষ খাওয়া।
সায়ন মুখ তুলিয়া তানিয়ার দিকে চাহিয়া রইল। তানিয়া তাহাকে সকল ঘটনা বলিল।
সমস্ত শুনিয়া সায়ন বলিল- বৌদি তুমি আর্শিবাদ কর যেন আমি একাই আমাকে জয় করতে পারি।
বলিয়া চলিয়া গেল।
বৌদি-কিরে সব গুলো খা সানু।
সানু- না। আজ আর খিদে নেই বৌদি।
তানিয়ার চোখে জল টলমল করিতেছে। হাত মুখ ধুইয়া আসিয়া সায়ন তানিয়া কে প্রণাম করিল। বলিল- আর্শিবাদ কর বৌদি। মা থাকলে কি আমাকে কেউ এমন করতে পারতো।
ঝড় করিয়া তানিয়ার চোখের জল তাহার দুই গাল বাহিয়া পড়িতে লাগিল। সায়নের চোখেও জল টলমল করিতেছে।
পরদিন হইতে নীচের দুইটি ঘর সায়নের জন্য বরাদ্দ করিয়া তাহাকে বলা হইল সে যেন বাড়ির ভিতরে না আসে। সায়ন সব মানিয়া লইল। দক্ষিনের দরজাটি কাহুদিন হইতে বন্ধ ছিল। আজ সেই দরজা সায়নের সদর দরজা হইল।
তানিয়ার কাছে সায়নের কিছু জমানো টাকা ছিল। তানিয়া এক সময় আসিয়া তাহার আদরের সানু কে তাহা দিয়া বলিল- ঢাকা গুলো রাখ। একটা স্টোড আর রান্নার কিছু জিনিস কিনে আন। কদিন একটু-অসুবিধা হবে। আর আমি তো আছি। লুকিয়ে লুকিয়ে আসব। সায়ন বৌদির হাত হইতে টাকাটা লইয়া জানালা দিয়া বাইরের দিকে চাহিয়া রহিল।
বৌদি - কিরে যা। চাল, ডাল আনতে ভুলিস না।
বলিয়া তানিয়া চলিয়া গেল। সায়ন বাজারের দিকে অগ্রসর হইল।
