অতনু সরকার
আমি সেই সায়ন। রাতে ছেলে-মেয়েদের পড়ানো। নিজের পড়া। আর দিনের বেলা ফুটবল লইয়া আমার নতুন জীবন শুরু চলিতে লাগিল। দুপুরের আহার দুটো ভাত ফুটাইয়া কিছু একতা ভাজা আর ছুরি করিয়া বৌদি কিছু দিয়া গেলে খাওয়া হয়। আমি বেশি কিছু রাধিতে পারিনা। রাতেও তাই। সকালে উঠিয়া জল তুলিয়া যাই অনুশীলনে। ফিরিয়া রান্না। বিকাল হইলে আবার মাঠে।
মায়ের ঘরে একটা পুরনো আলমারিতে অনেক গুলি গল্পের বই আছে। অবসরে তাহা পড়িয়া সময় কাটে। আমি ও দু-একটা কিনি। মোট কথা হইল আমি এখন বেশ আছি। মাসে যাহা পাই তাহা দিয়া আমার একার অন্ন-জুটিয়া যায়। রোজ দুপুর হইলে ছোট্ট সোনা আমার কাছে চলিয়া আসে। আমি যে তাহার খেলার সঙ্গি। হয়তো সোনা ছোট বলিয়া তাহার আসা যাওয়ার কোন বাঁধা নাই। কিন্ত তাতেও মেজ বৌদির রাগ। মনিকা কে আমি নাকি আদর করি না। আসলে সে যে খুব ছোট। আর সোনা? সেই খুব ছোট হইতেই আমার কাছে। শ্রেয়াদি এমন নাই। তাই সোনা আর আমি দুপুরে সময় কাটাই। ওর কথা শুনিলে প্রাণ জুড়াইয়া যায়। আমি যেমন আমার এই ভাইজি কে না দেখিয়া থাকিতে পারি না তেমনি সে ও আমাকে ছাড়া থাকিতে পারে না।
দেখিতে দেখিতে একটি বছর কাটিয়া গেল। সোনা এখন স্কুলে যায়। আর দুপুরে তাহার পুতুল খেলার খেলনা লইয়া আমার কাছে চলিয়া আসে। রাতে যখন ছেলেরা পড়িতে আসে তখন কোন কোন দিন সেও দুটি বই লইয়া চলিয়া আসে। বৌদি বারণ করিলে ও শোনে না। বৌদি বেশি জোর করে না।
আমি বি.এ পরীক্ষা দিলাম আর টিউশানি একটু বাড়াইয়া দিলাম। হুগলীর পর কলকাতায় আমার নাম ধীরে ধীরে বাড়িতেছিল। সামনের বছর বড় ক্লাবে খেলার অফার রহিয়াছে।
কিন্তু নদীর স্রোত যেমন চিরকাল সোজা প্রবাহিত না হইয়া মাঝে মাঝে বাঁকা পথ ধরে তেমনি জীবনের পথ ও কখনো কখনো বাঁকিয়া প্রবাহিত হয়।
একদিন আমি বিকালে বাড়ি ফিরিতেছি, হাঁটা পথ। নিজের খেয়ালে, আপন মনে পথ চলিতেছি। গিয়াছিলাম এক বন্ধুর বাড়ি। হাঁটা শ্রেয় মনে করিলাম। শীত কাল। গায়ে একটি চাদর। হঠাৎ পিছন দিক হইতে একটি স্কুটার আসিয়া ধাক্কা মারিল।
যমন জ্ঞান ফিরিল দেখিলাম পা টা খুব ব্যাথা, আমি হাসপালে শুইয়া আছি। বুঝিলাম পা' যন্ত্রনা করিতেছে। আমার পাশে বসিয়া রহিয়াছে একজন অপরিচিতা ভদ্রমহিলা এবং তাহার পাশে আর এক জন।
অনেক ক্ষণ পর সেই অপরিচিতা আমায় জিজ্ঞাসা করিল- কি নাম তোমার।
আমি - সানু মানে সায়ন সরকার।
মহিলা- যন্ত্রনা হচ্ছে খুব?
আমি – বেশি করেই হচ্ছে।
মহিলা- তোমার বাড়ি কোথায়, একাটা খবর দেব।
আমি- আমার বাড়ী আছে খবর দেবার কেউ নেই। কিন্তু আপনি কে?
মহিলা বলিল- আসলে মেয়ে তোমায় ধাক্কা দিয়েছিল।
আমি - মনে হয় পা টা ভেঙ্গেছে।
মহিলা- ভয় নেই আমরা তোমার সব খরচ দেব।
আমি - না তা নয়। আসলে আমার অবস্থা টা আপনি বুঝবেন না।
মহিলা- বেশ। কাল পায়ে এক্সরে হবে।। আপাতত কয়েকদিন এখানে থাকতে হবে।
আমি একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া বলিলাম- আমার ভাগ্য।
মহিলাটি বোধ করি একটু লজ্জা পাইলেন। দেখিয়া বেশ সম্ভ্রান্ত বলিয়া মনে হয়। বয়স চল্লিশ পার হইয়া গিয়াছে রাত হইয়াছে দেখিয়া সেই ভদ্রমহিলা বলিল- আজ যাই ভাই। কাল সবকালে আসব।
কথা শেষ করিয়া মহিলা চলিয়া গেলে। আমি নার্সকে বলিলাম -দিদি
একটা কাজগ পেন দিতে পারেন?
নাস - কি করবেন?
আমি- একটা চিঠি লিখব।
নার্স- আমার কাছে একটা ইনল্যান্ড লেটার আছে দেব?
আমি- আপনার যদি অসুবিধা না হয় দিন। তাহলে আমারই সুবিধা হয়।
নার্স দিদি চলিয়া গেল। ইনল্যান্ড লেটার এবং একটি পেন দিয়া সে অন্যত্র চলিয়া গেল।
আমি চিঠি লিখিতে শুরু করিলাম।
“দিদি,
পত্রের প্রথমে আমার প্রনাম রহিল। সুমিতদা আমার প্রনাম জানাইয়া দিবি। আশা করিতেছি তুই ভালোই আছিস।
তবে এই অবস্থায় পড়িয়া তোকে পত্র লিখিতে হবে ভাবি নাই। আমি আজ এক সঙ্কট ময় পরিস্থিতিতে পড়িয়া লিখিতেছি। বিগত কয়েক মাস হইতে আমি আলাদা। মেঝ বৌদি ছোটবৌদি আর তাহাদের প্রবল ভালোবাসার জন্য আমাকে আলাদা থাকিতে হয়। সব কথা চিঠিতে লেখা যায় না। বৌদি আমার জন্য কিছু করিতে পারে নাই। বাকি কথা পরে বলিব।
আপতত আমি এখন হাসপালে অবস্থান করিতেছি। বিশেষ কিছু হয় নাই বলিয়া মনে হইতেছে।যদি সময় করিতে পারিস তাহা হইলে একবার আমার সদর হাসপাতালে আসিয়া দেখা করিস। তোকে খুবই প্রয়োজন।
ইশ্বরের কাছে তোর পরিবারের কুশল কামনা করি।
তোর সানু
চুঁচুড়া সদর হাসপাতাল”।
চিঠি শেষ করিইয়া এবাবার পড়িলাম। তাহার পর রাখিলাম। পরদিন সকালে সেই নার্স দিদির হাত দিয়া ডাকে পাঠাইবার ব্যবস্থা করিলাম।
এক্সরে করিয়া জানা গেল আমার একটি হাড় ভাঙিয়া গিয়াছে, তবে অল্প। স্কুটারটি পায়ের উপর পড়িয়া ছিল বলিয়া এই ঘটনা ঘটিয়াছে। ডাক্তার বলিলেন দুই মাস বিশ্রাম। পাপ্লাস্টার করা হইয়াছে। যেদিন প্লাস্টার করা হইল সেদিন বিকালে দিদি আসিয়া হাজির। হ্যাঁ এই সেই শ্রেয়াদি যে এক সময় আমার খেলার সাথী- ছিল। দিদি আসিয়া কাঁদিয়া পাড়িল।
আমি প্রথমে আমার বর্তমান অবস্থার কথা বর্ননা করিলাম, তাহার পর বাড়িতে ঘটিয়া যাওয়া সকল কথা বলিলাম। শুনি্যা দিদি চুপ করিয়া গেল। আমার মাথায় হাত বুলাইতে লাগিল। দিদির সঙ্গে তাহার স্বামী সুমিতদা ও আসিয়া ছিল। সেও সব কথা শুনিল। সুমিত দা খেলা পাগল লোক বলিয়া আমার সহিত তাহার খুব ভাব।
দিদি আনক ক্ষন চুপ ব করিয়া বলিল-তোর চলে কি করে?
আমি - খেলে আর টিউশানি করে।
সুসিতদা- তোমার খেলার সব খবর কি?
আমি - বড় ক্লাবের ডাক আছে। অনেক টাকা ও দেবে।কিন্তু পাটা যে কি হবে।
দিদি - চল আমার বাড়ীতে গিয়ে থাকবি কটা দিন, তারপর না হয় দেখা যাবে।
আমি- তাহলে আমার টিউশানি চলে যাবে।
দিদি আর কিছু বলিল না।
সুমিতদা বলিল- বাড়ির লোক জানে?
আমি - না।
দিদি- বৌদি?
আমি - না।
দিদি- জানিয়ে দেব?
আমি- না বৌদি সন্তান সম্ভাবা। তার শরীর খারাপ।
দিদি আর কিছু বলিল না। তাহারা চলিয়া গেল।
পরদিন আরও অবাক হইলাম। সকালে চায়ে সবে একটা চুমুক দিয়াছি বৌদি আসিয়া হাজির। সঙ্গে সোনা। আর আমার দুই ঘনিষ্ট বন্ধু তারক আর সৌউম। বুঝিলাম ওরাই খবরটা দিয়েছে । ওরাও বৌদির খুব প্রিয়।
বৌদি আমার কাছে আসিল। তাহার পর বলিল- আমার উপর তোর কিসের রাগ?
আমি- তোমার শরীর খারাপ তাই।
বৌদি-তাই বলে একটা খবর দিতে নেই।
ততক্ষনে সোনা আমার বিছানায় উঠিয়া গেছে। বৌদির কথা শেষ হইতেই সে বলিল- ছোটকাকা তোমার পায়ে কি হয়েছে?
তাহার মিস্টি কথা গুলি আমার খুবই ভালোলাগে। তাহাকে দেখিয়া আমি খুব খুশি হইয়াছিলাম। এই তিনদিন তাহাকে না দেখিয়া তাহার কথা শুনিয়া কেমন মন খারাপ ছিল।
বলিলাম- একটু লেগেছে।
বৌদি- কবে ছাড়বে?
আমার বলিবার আগেই তারক বলিল- এখন ও দুই দিন থাকতে হবে।
বৌদি আমার মাথায় হাত বুলাইতে লাগিল। আমি ও এতদিনে পুরন স্নেহ ফিরিয়া আরাম পাইলাম।
বলিলাম-বড়দা জানে।
বৌদি- জানে।
আমি- অন্যরা?
বৌদি - জানি না।
আমি- ওদের জানিয়ে কাজ নেই।
বৌদি আমার আগের মতো আদর করিতে করিতে বলিল - আমার উপর রাগ করেছিস।
আমি বৌদির হাত ধরিয়া বলিলাম - তোমার উপর রাগ করব আমি
যাবার সময় সোনা বলিল- ছোট কাকা বাড়ি যাবে?
আমি-দু-দিন পর।
সোনা-ঠিক তো।
আমি-হ্যাঁ।
আমি তারক আর সৌম্য সে বলিলাম - বৌদি কে বাড়িতে পৌছে দিস।
তাহারা চলিয়া গেল ।
